দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী তিন দিনের ভূমি মেলায় জনগণের ব্যাপক সাড়া মিলেছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত হওয়া সেবা গ্রহীতাদের মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে ঘরে বসেই ভূমি বিষয়ে নানা সেবা নেয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তাতে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা ছাড়া সেবা গ্রহীতাগণ স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা নিতে পারছেন। এতে বেহুদা অর্থের অবচয়রোধ এবং সময়েরও সাশ্রয় হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ভূমি ব্যবস্থাপনা ছিল দুর্নীতি, দালালচক্র, নথি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম ক্ষেত্র। জমির খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা মালিকানাসংক্রান্ত সেবার জন্য সাধারণ মানুষকে বারবার সরকারি অফিসে যেতে হতো। তবে গত কয়েক বছরে সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল ও জনবান্ধব করতে ধারাবাহিক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও অনেক গ্রাহক ও সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে প্রযুক্তিনির্ভর ভূমি ব্যবস্থাপনা তৈরিতে নতুন পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সমস্যার কারণে অনলাইন সেবা গ্রহণে বাধা তৈরি হচ্ছে। আবার অনেক সাধারণ মানুষ ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা বাড়লেও কিছু স্থানে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং সেবা পেতে বিলম্বের অভিযোগও রয়েছে।
এ দিকে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার দেশব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ আয়োজন করেছে। গত ১৯ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী দেশের উপজেলা ভূমি অফিসের তত্ত্বাবধানে এই মেলার আয়োজন করা হয়ে। এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জনবান্ধব স্বয়ংক্রিয় ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ভূমি ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ডিজিটাল ভূমি সেবাগুলো পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক সেবাও দেয়া হয়েছে। খধহফ ঝবৎারপব ঋধরৎ-২০২৬-এ অনলাইনে ই-নামজারি আবেদন, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, খতিয়ান সংগ্রহ এবং মৌজা মানচিত্র সংগ্রহের সুবিধা তুলে ধরা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-নামজারি আবেদন এবং বিভিন্ন ভূমি নথি সংগ্রহ করা যাচ্ছে। এ ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয় নতুন সমন্বিত মোবাইল অ্যাপ ইযঁসর চালু করেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে কর প্রদান, খতিয়ান কপি সংগ্রহ, ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ (উঈজ) গ্রহণ এবং অন্যান্য সেবা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমি হস্তান্তরের পর নতুন মালিকের খতিয়ানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংযুক্ত হবে এবং পূর্ব মালিকের রেকর্ড থেকে তা বাদ যাবে। এর ফলে একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি বা জালিয়াতির সুযোগ কমে আসবে। এ ছাড়া সরকার ডিজিটাল ভূমি জরিপ, ল্যান্ড জোনিং এবং একীভূত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসের মধ্যে তথ্য সমন্বয় ঘটবে। ফলে দলিল নিবন্ধনের পর আলাদা করে নামজারির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা কমে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ৬১ জেলায় ৮৯৩টি ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, তারা এসব কেন্দ্রে গিয়ে সহায়তা নিতে পারবেন। ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পর্যায়েও এ ধরনের কেন্দ্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রযুক্তিগত উদ্যোগ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি কমেনি। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সমস্যার কারণে অনলাইন সেবা গ্রহণে বাধা তৈরি হচ্ছে। আবার অনেক সাধারণ মানুষ ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা বাড়লেও কিছু স্থানে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং সেবা পেতে বিলম্বের অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সফটওয়্যার বা অ্যাপ চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ভূমি রেকর্ডের শতভাগ নির্ভুলতা নিশ্চিত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাঠ প্রশাসনের জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্য সংযুক্ত হলে তা ভবিষ্যতে আরো বড় জটিলতার কারণ হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট ভূমি সেক্টরের বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে সাধারণ মানুষের সময়, অর্থ এবং ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভূমি খাত এখন পরিবর্তনের পথে রয়েছে; সেই পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে ভূমিমন্ত্রী মো: মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমিসেবা নিশ্চিত করতেই বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ শুরু করছে।
তিনি বলেন, আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ জনসেবামূলক ও জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চাই।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সব ভূমিসেবা বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি। এই মন্ত্রণালয় জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং এটিকে আরো গ্রহণযোগ্য করতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ভূমিসংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সরকার দ্রুতই সংসদে একটি নতুন বিল আনবে বলেও জানান মন্ত্রী। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ জানান, ভূমির জটিল সমস্যাগুলো একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। তবে আমরা একটি টেকসই, আধুনিক ও জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে কাজ করছি। ইতোমধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আধুনিক করতে অটোমেশন প্রকল্প দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বাস্তবায়নের ফলে ভূমিসংক্রান্ত সেবা আরো সহজ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত হবে।



