বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা এবং শিল্পায়নের প্রসারে এ খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। তবে উচ্চ সুদের হার, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মতো নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসএমই দিবস উপলক্ষে দেশের এসএমই খাতের বর্তমান অবস্থা, ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিকল্পনা, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ এবং আগামী দিনের কৌশল নিয়ে কথা বলেছেন ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশরাফুল ইসলাম।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি; কিন্তু এখনো অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত জামানত বা গ্রহণযোগ্য আর্থিক ইতিহাস না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। একই সাথে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা এই খাতকে আরো কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। তাই শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না; বরং একটি প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উদ্যোক্তাবান্ধব আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
প্রশ্ন : ট্রাস্ট ব্যাংকের এসএমই অর্থায়নের বর্তমান কৌশল কী?
উত্তর : এসএমই অর্থায়ন আমাদের ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা ক্লাস্টার-ভিত্তিক ঋণ, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং, খাতভিত্তিক বিশেষায়িত অর্থায়ন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করছি। পাশাপাশি ডিজিটাল ন্যানো ঋণ, দ্রুত ঋণ অনুমোদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে অর্থায়ন পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : উচ্চ সুদের হার ও ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধির সময়ে উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছেন?
উত্তর : আমরা উদ্যোক্তার ব্যবসার ধরন ও নগদ প্রবাহ বিবেচনা করে নমনীয় অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তুলনামূলক কম সুদে ঋণের সুযোগ করে দিচ্ছি। পাশাপাশি জামানতবিহীন বা আংশিক জামানতভিত্তিক ঋণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং দ্রুত ঋণ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ব্যবসায়িক চাপ কমানোর চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন : নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কি বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে?
উত্তর : নারী উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের জন্য ‘ট্রাস্ট নন্দিনী’ কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন সহায়তা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় সহজ শর্তে ঋণসুবিধাও প্রদান করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ আরো বিস্তৃত করা।
প্রশ্ন : আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করবেন?
উত্তর : আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমরা সহজ শর্তে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছি এবং সেই হিসাবের সাথে ক্ষুদ্র ঋণসুবিধা যুক্ত করেছি। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজতর ঋণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিয়ে আসার কাজ চলছে।
প্রশ্ন : ডিজিটাল ব্যাংকিং এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য কি পরিবর্তন এনেছে?
উত্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিং উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। এখন মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লেনদেন, কিস্তি পরিশোধ, হিসাব পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করা যাচ্ছে। ই-কেওয়াইসি এবং ডিজিটাল প্রসেসিংয়ের কারণে ঋণ অনুমোদনও দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে।
প্রশ্ন : তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
উত্তর : প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলো ভবিষ্যতের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই প্রচলিত আর্থিক সূচকের পাশাপাশি আমরা তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা, বাজার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগ বিবেচনা করি। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টার্টআপ অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় যোগ্য উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অর্থায়নের সুযোগও রয়েছে।
প্রশ্ন : এসএমই ঋণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কিভাবে করা হয়?
উত্তর : এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক বিবরণী নয়, উদ্যোক্তার সততা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, বাজারের চাহিদা এবং বাস্তব পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করা হয়। ঋণ বিতরণের পরও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
প্রশ্ন : রফতানিমুখী এসএমই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে রফতানিমুখী এসএমই খাতের বিকাশ অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে আধুনিক ট্রেড ফাইন্যান্স, এক্সপোর্ট ফ্যাক্টরিং এবং অন্যান্য আর্থিক সেবার প্রয়োজন। ট্রাস্ট ব্যাংক শুধু অর্থায়নকারী নয়, উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও কাজ করতে চায়।
প্রশ্ন : আগামী পাঁচ বছরের জন্য আপনাদের ভিশন কী?
উত্তর : আমরা একটি প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই এসএমই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চাই, যেখানে উদ্যোক্তারা সহজ, দ্রুত ও স্মার্ট ব্যাংকিং সেবা পাবেন। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং রফতানিমুখী সক্ষমতার সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেয়াই আমাদের লক্ষ্য।
প্রশ্ন : উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
উত্তর : দেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি আমাদের উদ্যোক্তারা। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং হিসাবভিত্তিক ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা থাকলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। ট্রাস্ট ব্যাংক শুধু অর্থায়ন নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক উন্নয়নের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উদ্যোক্তাদের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।



