আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। রাজনৈতিক দলগুলো যখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন একটি বেসরকারি জাতীয় জরিপে উঠে এসেছে নির্বাচনী রাজনীতির এক নতুন বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের বিএনপি-আওয়ামী লীগ দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতার গণ্ডি ভেঙে এবার ক্ষমতার ময়দানে মুখোমুখি হচ্ছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র- বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
জরিপ বলছে, দুই দলের সমর্থনের ব্যবধান অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। ফলে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে সিদ্ধান্তহীন ১৭ শতাংশ ভোটারের ওপর-যারা শেষ মুহূর্তে হয়ে উঠতে পারেন প্রকৃত ‘কিংমেকার’।
গত ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনে জরিপটি পরিচালিত হয়। প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি), জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভ যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে। জরিপের শিরোনাম ছিল- “প্রি-ইলেকশন পালস : অ্যান ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশী ইলেক্টোরেট।”
জরিপে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত ভোটারদের ঝোঁক তুলনামূলকভাবে জামায়াতের দিকে, আর কম শিক্ষিত ভোটারদের সমর্থন বেশি বিএনপির দিকে।
ভোটার উপস্থিতি উঁচু, আস্থার সঙ্কট গভীর
জরিপ অনুযায়ী, ৮৬.৩ শতাংশ ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী। মাত্র ২.৩ শতাংশ ভোট না দেয়ার কথা বলেছেন এবং ১১.৪ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তরুণ, শহুরে ও শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে দ্বিধা ও আস্থার সঙ্কট স্পষ্ট। এক দিকে বিএনপি সমর্থন পাচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা থেকে, অন্য দিকে জামায়াত এগিয়ে রয়েছে সততা, দুর্নীতিবিরোধী ভাবমর্যাদা ও পরিবর্তনের রাজনীতির বার্তায়।
এই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয় বরং পরিবর্তন বনাম স্থিতিশীলতার এক গভীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন হয়ে উঠছে।
জরিপের পদ্ধতিগত শক্তি
জরিপে অংশ নেন মোট ২২ হাজার ১৭৪ জন ভোটার। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নগর-গ্রামের প্রকৃত জনসংখ্যার অনুপাত বজায় রেখে নমুনা নির্বাচন করা হয়েছে। জেলা ও বসবাসের ধরন অনুযায়ী স্তরবিন্যাস-পরবর্তী ওজন প্রয়োগ করায় অতিনমুনায়িত জেলা ( যেমন ঢাকা) ও স্বল্পনমুনায়িত জেলা (যেমন বান্দরবান)-এর প্রভাব ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে। গড় সাক্ষাৎকার সময় ছিল ১১ মিনিট।
জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন। আলোচনায় অংশ নেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক ড. মুশতাক হোসেন খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেসের ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) আমসা আমিন, বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী একেএম ফাহিম মাশরুরসহ একাধিক গবেষক ও বিশ্লেষক।
দলীয় সমর্থনের বর্তমান চিত্র
বর্তমান অবস্থায় সমর্থনের হার
- বিএনপি : ৩৪.৭%
- জামায়াতে ইসলামী : ৩৩.৬%
- অনিশ্চিত : ১৭.০%
- এনসিপি : ৭.১%
- ইসলামী আন্দোলন : ৩.১%
- অন্যান্য : ৪.৫%
অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত কার্যত সমানে সমান অবস্থানে রয়েছে।
মেশিন লার্নিং পূর্বাভাস : হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
অনিশ্চিত ভোটারদের আচরণ বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং মডেল প্রয়োগ করলে সম্ভাব্য চিত্র দাঁড়ায়-
- বিএনপি : ৪৩.২%
- জামায়াত : ৪০.৮%
- এনসিপি : ৭.৭%
- অন্যান্য : ৫.৩%
- ইসলামী আন্দোলন : ৩.০%
এ হিসাব অনুযায়ী বিএনপি সামান্য এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। জোট কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন ও মাঠপর্যায়ের সংগঠনই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
তরুণ ভোটার : সবচেয়ে অনিশ্চিত শক্তি
১৮-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন তুলনামূলক কম (প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ) এবং অনিশ্চিত ভোটারের হার বেশি। তরুণরা মূলত পরিবর্তন, দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সংবেদনশীল।
নগর-গ্রাম বিভাজন
গ্রামীণ এলাকায় বিএনপির সমর্থন ৩৫.৯ শতাংশ, শহরে ৩১.৯ শতাংশ। শহরে অনিশ্চিত ভোটারের হার ২১.৫ শতাংশ- যা নগর মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নির্দেশ করে।
আঞ্চলিক শক্তির মানচিত্র
- ময়মনসিংহ ও বরিশাল : বিএনপি শক্তিশালী (৪২-৪৭%)
- রাজশাহী ও খুলনা : বিএনপি-জামায়াত প্রায় সমান
- ঢাকা ও সিলেট : অনিশ্চিত ভোটার বেশি
- চট্টগ্রাম : বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
শিক্ষা ও পেশাভিত্তিক প্রবণতা
নি¤œ শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন বেশি (৩৯-৪০%)। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ঝোঁক লক্ষণীয়। শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন সবচেয়ে কম।
দলগুলো কেন সমর্থন পাচ্ছে
বিএনপি : অতীত শাসন অভিজ্ঞতা (৭২%); রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা; স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা
জামায়াত : দুর্নীতিমুক্ত ভাবমর্যাদা; সততা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা; পরিবর্তনের রাজনীতি
এনসিপি : জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা; সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য;
অনিশ্চিত ভোটারদের দ্বিধার কারণ : কোনো দলের ওপর আস্থা নেই- ৩৮.৬%; রাজনীতিতে আগ্রহ কম- ৩০.১%; রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা- ১৮.১%; ইশতেহার দেখার অপেক্ষা ১০.২%; অংশগ্রহণ অনিশ্চয়তার ঝুঁকি।
যদি কোনো বড় দল নির্বাচন বর্জন করে, তবে তাদের সমর্থকদের বড় অংশ ভোটে না-ও আসতে পারে। এতে ভোটের বৈধতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়তে পারে। জরিপে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ৫৮.৬ শতাংশ ভোট না দেয়ার কথা বলেছেন, যদি দল নির্বাচন না করে।
পরিবর্তন বনাম স্থিতিশীলতা : মূল দ্বন্দ্ব
ড. মুশতাক হোসেন খান বলেন, আগের জরিপে বিএনপি জামায়াতের চেয়ে এগিয়ে ছিল, কিন্তু বর্তমান জরিপে জামায়াত-এনসিপি-ইসলামী আন্দোলনের সম্মিলিত শক্তি বিএনপির চেয়ে এগিয়ে। তরুণ, শিক্ষিত ও শহুরে ভোটাররা পরিবর্তনের রাজনীতির দিকে ঝুঁকছেন। অন্য দিকে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণী স্থিতিশীলতার কারণে বিএনপির দিকে ঝুঁকছে।
তার মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি বৈপ্লবিক মোড় তৈরি করেছে। একটি অংশ মৌলিক পরিবর্তন চায়, অন্য অংশ চায় দ্রুত স্থিতিশীলতা। এই দ্বন্দ্বই আসন্ন নির্বাচনের মূল রাজনৈতিক চালিকাশক্তি।
মেজর জেনারেল (অব:) আমসা আমিন মনে করেন, ভারতের আধিপত্যবাদী প্রভাবের প্রশ্নে যেসব দল আপসহীন অবস্থানে থাকবে, তারাই ভোটে সুবিধা পাবে।
ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচন করছে এবং প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ নির্বাচনের মাঠে নেই। নতুন শক্তি হিসেবে এনসিপির উত্থানও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অভিঘাত : কোন পথে বাংলাদেশ
জরিপ তিনটি বড় ইঙ্গিত দেয়-
১) দ্বিদলীয় রাজনীতি ভেঙে এখন দ্বিশক্তির প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে।
২) নৈতিকতা ও দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতি ভোটারের প্রধান প্রত্যাশা হয়ে উঠছে।
৩) তরুণ ও শহুরে ভোটারদের আস্থার সঙ্কট ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয় বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আদর্শ ও রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।
(বিস্তারিত গ্রাফ ৩য় পৃষ্ঠায়)



