বেগম খালেদা জিয়া : ক্ষমতা ও প্রতিরোধের জীবন

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার প্রবেশ কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল ছিল না; বরং ছিল রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার পরিণতি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক বিদ্রোহে তার স্বামী ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বাংলাদেশ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পর দেশকে স্থিতিশীল করা এই নেতা রেখে যান একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং একটি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)- যা হঠাৎ করেই তার প্রতিষ্ঠাতাকে হারায়।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

আশির দশকে বাংলাদেশের এই নেত্রী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার সাথে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি টানে। ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষতান্ত্রিক ও কর্তৃত্বনির্ভর একটি সমাজে দুই মুসলিম নারীর এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল।

তবে শেখ হাসিনার মতোই খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারও পুরোপুরি একরঙা নয়- বরং ধূসর। উভয়েই গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তবে পার্থক্য হলো, শেখ হাসিনার বিপরীতে খালেদা জিয়াকে কখনও সমালোচকদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। তবু তিনি ছিলেন এক গভীরভাবে মেরুকরণকারী রাজনৈতিক চরিত্র।

বিরোধী দলে থাকাকালীন তার আপসহীন রাজনৈতিক কৌশল- নির্বাচন বর্জন, দীর্ঘমেয়াদি রাজপথ আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগ- এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতা তাকে সমর্থকদের কাছে গভীর আনুগত্যের প্রতীক এবং সমালোচকদের কাছে তীব্র অবিশ্বাসের কেন্দ্রে পরিণত করে।

ডিসেম্বরের শুরুতে বিএনপির তৃণমূলকর্মী, ৪৮ বছর বয়সী টিপু সুলতান, ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাতে লেখা ছিল- ‘আমি বেগম খালেদা জিয়াকে আমার কিডনি দান করতে চাই।’ তিনি আল জাজিরাকে বলেন, যতদিন না তার নেত্রীর সুস্থতার খবর পাওয়া যায়, ততদিন তিনি হাসপাতালের গেটের সামনে থাকবেন।

‘তিনি আমার মায়ের মতো। গণতন্ত্রের জন্য তিনি সবকিছু ত্যাগ করেছেন। আমার একমাত্র প্রার্থনা, আল্লাহ যেন তাকে আসন্ন নির্বাচন দেখার সুযোগ দেন,’ টিপু বলেন।

উত্থান : রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার প্রবেশ কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল ছিল না; বরং ছিল রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার পরিণতি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক বিদ্রোহে তার স্বামী ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বাংলাদেশ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পর দেশকে স্থিতিশীল করা এই নেতা রেখে যান একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং একটি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)- যা হঠাৎ করেই তার প্রতিষ্ঠাতাকে হারায়।

যদিও রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না, বিএনপির শীর্ষ নেতারা তাকেই এমন একমাত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেছিলেন, যিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার রক্ষা করতে পারেন।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হন এবং একটি নির্বাচনে জয়লাভ করেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং সামরিক আইন জারি করেন। এই রাজনৈতিক শূন্যতা ও দমনমূলক বাস্তবতায় খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে একজন কেন্দ্রীয় বেসামরিক নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন, ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী তিন দশকে তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং শেখ হাসিনার সাথে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দ্বিদলীয় আধিপত্যের কাঠামোয় রূপ দেন।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক একাকিত্ব : তার রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনও ছিল গভীর বেদনাবিধুর। বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়ে পরে নির্বাসনে যান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে বিদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে খালেদা জিয়া নিজেও কারাবরণ করেন। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অসুস্থতা ও কার্যত নিঃসঙ্গতা তার জীবনের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘তার পুরো জীবন ছিল কষ্টে ভরা। তবুও তিনি ব্যক্তিগত আরামের চেয়ে দেশকে বেছে নিয়েছিলেন। সে কারণেই তিনি তার সময়ের সবচেয়ে প্রতীকী রাজনৈতিক নেত্রীদের একজন।’

রাজনীতির আগে খালেদা : জনজীবনে প্রবেশের আগে যারা তাকে চিনতেন, তারা তাকে সংযত, শান্ত ও বিনয়ী একজন নারী হিসেবে বর্ণনা করেন। জিয়াউর রহমানের সহকারী কর্নেল হারুনুর রশিদ খান বলেন, ‘তিনি নিজেই সংসারের কাজ করতেন, অতিথিদের স্বাগত জানাতেন। আমি তাকে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখিনি। তিনি ছিলেন নম্র, দয়ালু ও চিন্তাশীল।’

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী : এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন অটল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত তাকে নীতির প্রশ্নে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর মতে, অসুস্থতা সত্ত্বেও গ্রেফতার বরণ করার প্রস্তুতি তাকে জনমনে সম্মানিত করে।

১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে। এই সমঝোতা ও কৌশলগত দৃঢ়তা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়।

শাসন, সংস্কার ও বিতর্ক : খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৯৯১-৯৬, ১৯৯৬ (স্বল্পকাল) এবং ২০০১-০৬। তার সরকারের সময় অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি, পোশাক খাতের বিস্তার এবং নারী শিক্ষার প্রসার ঘটে। সংবাদমাধ্যমও তুলনামূলক স্বাধীনতা ভোগ করে।

২০০৬ সালে তার মেয়াদ শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সর্বোচ্চ। তখন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ‘এশিয়ার পরবর্তী বাঘ অর্থনীতি’ হিসেবে অভিহিত করে।

‘গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার’: বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘খালেদা জিয়া কখনো তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। ১/১১ কিংবা পরবর্তী সময়েও দল ভাঙার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’

রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অনেক রাজনীতিবিদ সুবিধা ভোগ করলেও খালেদা জিয়াকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে কারাবাস, নিপীড়ন ও পারিবারিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে।’ ২০০৭ সালের পর কিংবা শেখ হাসিনার আমলে নির্বাসনে না গিয়ে দেশে থেকে পরিণতি ভোগ করার সিদ্ধান্ত বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে খালেদা জিয়ার প্রতিশোধ না নেয়ার আহ্বান অনেকের কাছে ছিল বিস্ময়কর। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক জোয়ার তার পক্ষে থাকা সত্ত্বেও তিনি সংযম দেখিয়েছেন এটি বিরল।’

উত্তরাধিকার ও সামনে পথ : বিএনপি মনে করে, তারেক রহমান ইতোমধ্যেই তার বাবা জিয়াউর রহমান ও মাতা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মশাল বহন করছেন। সামনে আসন্ন নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, বরং এই প্রশ্নও উত্থাপন করবে, বাংলাদেশ কি খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে তার উত্তরসূরির হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত?