কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বড় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল মাহামুদুর রহমান সৈকতের। সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ঘাতকের একটি বুলেট মুহূর্তেই কেড়ে নেয় তার সব স্বপ্ন-সাধ। জুলাই আহত-শহীদের নিয়ে অশ্লীল বিদ্রুপের কারণে সৈকতে পরিবার এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
২০২৪ সালের জুলাই। ঢাকা শহরের অলিগলিতে তখন ছড়িয়ে পড়েছিল চাপা উত্তেজনা। সবার মুখে মুখে একই প্রশ্ন; কী হবে এরপর? দেশের সব ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলছিল অবিরাম মিটিং-মিছিল। মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে বসবাসকারী সৈকতের বাবার ব্যবসাটি ছিল ঋণে জর্জরিত। বাবার মলিন মুখটার কথা মনে করে প্রায়ই আফসোস করতেন তরুণ সৈকত। তার চেতনাজুড়ে ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন। মেধার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার ন্যায্য দাবি। আন্দোলনের শুরু থেকেই ছিল তার মৌন সমর্থন, আর সহপাঠীরাও যে যার মতো সক্রিয় ছিলেন ওই আন্দোলনে।
মাহামুদুর রহমান সৈকত ছিল ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ। কাকতালীয়ভাবে শহীদ হন ১৯ জুলাই। ঢাকাতেই ২০০৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তার জন্ম। দুই বোনের একটি মাত্র ভাই। সে ছিল সবার ছোট। সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এবার বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনার্সে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসএসসিও পাস করেন একই প্রতিষ্ঠান থেকে। ক্রিকেট পাগল সৈকত ছিল লাজুক, শান্ত স্বভাবের অন্তর্মুখী চরিত্রের অধিকারী। ঘরে আজও পড়ে রয়েছে তার প্রিয় ব্যাট-বল। শখের প্রিয় সাইকেলটি সৈকতের বাবা আজও ধুয়ে মুছে রাখেন। সাইকেলের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কাঁদেন একা। ছেলে নেই। বিড় বিড় করে কথা বলেন সাইকেলের সাথে। সৈকতের যতো দুষ্টুমি ছিল পরিবারের সদস্য ও বন্ধু মহলে, বাইরের মানুষের তা বুঝার কোনো উপায় ছিল না।
সৈকতের শেষ মুহূর্ত
১৯ জুলাই সারা রাজধানী ছিল উত্তপ্ত। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে বাবা মাহাবুবুর রহমান বারবার ফোন করে ছেলেকে বাসায় ফিরে আসতে বলছিলেন, যাতে তিনি নিরাপদে থাকেন। কিন্তু সৈকত বাবাকে জানান, তার সহপাঠীরা গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তাই তিনি বন্ধুদের সাহায্য করতে যাবেন। ওই কথাই ছিল বাবার সাথে তার শেষ কথোপকথন।
কিছুক্ষণ পরই বাবার কাছে আসে এক ফোনকল। জানানো হয়, রায়েরবাজারে পুলিশের গুলি সৈকতের মাথায় আঘাত লেগেছে। গুলি মাথার সামনের দিক দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে গেছে। ১৯ জুলাই বেলা ৩টা ৩৭ মিনিটে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন সৈকত। আন্দোলনকারীরা তাকে ধরাধরি করে দ্রুত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে যান, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে স্বজনরা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সৈকতের মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা রক্তাক্ত লাশ শনাক্ত করেন। মৃত্যুর কারণ হিসেবে নথিতে লেখা হয় ‘গান শট’। হাসপাতাল থেকে সরাসরি মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলামে নিয়ে গোসল করানো হয় তার লাশ এবং সেখানেই রাখা হয়; সেদিন আর বাসায় আনা হয়নি। পরদিন মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
সৈকতের পরিবারের দাবি, তাকে যে পুলিশ কর্মকর্তা গুলি করেছিলেন তাকে তারা শনাক্ত করতে পেরেছে। পরিবারের ভাষ্যমতে, মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম ওই গুলি চালিয়েছিলেন। গুলি করার পর তাকে উপস্থিত জনতা জিজ্ঞেস করেছিল- ‘ছেলেটাকে কেন গুলি করলেন’? তখন সে বলে- ‘দেখছেন না, ডিস্টার্ব করতেছিল’।
শহীদ পরিবারের আক্ষেপ
শহীদদের রেখে যাওয়া আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। সঠিক বিচারও পাচ্ছেনা শহীদ পরিবারগুলো বলে দাবি করেন শহীদ সৈকতের বাবা মাহাবুবুর রহমান। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বিচারের কোনো অগ্রগতিই দেখতে পেলাম না। বিচার পাবো,পাবো বলে ওই আশায় আছি। মনে হয় বিচার পাবো না। এ পর্যন্ত কোনো শহীদের কি বিচার হইল? রায় দেয়, আবার দেখি ওদেরকে ছেড়ে দেয়। বিচার তো পরের ব্যাপার জুলাই সনদ এখন পর্যন্ত মানতে রাজি না সরকার। কারে বিশ্বাস করব বলেন?
তিনি বলেন, দেশে শহীদ যারা হইছে, যারা আহত যোদ্ধা আর যাদের রক্তের বিনিময় ১৭ বছর পরে মুক্তি পেল এরা সব সন্ত্রাসী। এখন জুলাই আহত-শহীদের নিয়ে অশ্লীল ভাষায় যা বলে বা লেখে, সরকারও কি এগুলা দেখে না? এখন দেখা যাচ্ছে যে, যারা দেশের জন্য শহীদ হয়েছে এবং যারা আহত যোদ্ধা এরা সব সন্ত্রাসী। আমিও একজন শহীদের বাবা এবং বয়স্ক লোক। এমন পরিস্থিতি দেখে মন-মানসিকতা আরো ভেঙে পরে বলে জানান সৈকতের বাবা।



