- কারখানা বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে শত কোটি টাকা লোপাট
- পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ
গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: ইউসুফের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং ঘন ঘন পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিনি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় করেছেন এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের আস্থাভাজন। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে।
হ্নঅভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এক মাসের ব্যবধানে তাকে দু’টি পৃথক কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়। এ নিয়ে গণপূর্ত অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।
হ্নঅভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদফতরের ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল (ইএম) বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের সময় মো: ইউসুফের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ অপচয়, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হ্নদুদকের চেয়ারম্যান বরাবর দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রকৌশলী ইউসুফকে ঢাকার দু’টি পৃথক ইএম বিভাগে পদায়ন করা হয়। অভিযোগকারীর দাবি, ১ জানুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাকে গণপূর্ত ইএম বিভাগ-১৩-এ পদায়ন করা হয়। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি তাকে আবার গণপূর্ত ইএম বিভাগ-১-এ পদায়ন করা হয়।
হ্নঅভিযোগপত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, একজন কর্মকর্তাকে এত অল্পসময়ের ব্যবধানে কেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন ছিল কি না- তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
হ্নঅভিযোগে আরো দাবি করা হয়েছে, গত ৩১ জুলাই গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর আদেশে তাকে বদলি করা হলেও তার দায়িত্ব পালনকালে সংশ্লিষ্ট বিভাগে কথিত অনিয়মের আর্থিক প্রভাব দীর্ঘ দিন থাকবে।
এলটিএমে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ
হ্নঅভিযোগপত্রে প্রকৌশলী ইউসুপের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে ওপেন টেন্ডার মেথডের (ওটিএম) পরিবর্তে লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড (এলটিএম) ব্যবহার করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এতে উদাহরণ হিসেবে ২০২১-২২ অর্থবছরে সোবহানবাগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) ফোর্স ভেন্টিলেশন সিস্টেম স্থাপন, টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের একটি কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রায় ৯৯ লাখ ৮৩ হাজার ৬০৮ টাকা চুক্তিমূল্যের ওই কাজ ‘হোমল্যান্ড এজেন্সি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে এলটিএম পদ্ধতিতে দেয়া হয়।
হ্নঅভিযোগকারীর দাবি, ওই প্রকল্পসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়া হয়েছে।
হ্নবিভিন্ন প্রকল্পে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ
হ্নএ ছাড়া কয়েকটি সরকারি প্রকল্পের বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজ, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা এসব বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
হ্নসাবেক প্রতি মন্ত্রী শরীফ আহমেদের আস্থাভাজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো: ইউসুফ কারখানা বিভাগ থেকে শত কোটি লোপাট করে নির্বাচনের মধ্যে দুইবার অর্ডার করে প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন।
জানা গেছে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফ আহমেদকে অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করে মোহাম্মদ ইউসুফ গণপূর্ত ইএম কারখানা বিভাগ থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ফ্যাসিবাদী সরকারের অন্যতম দোসর ইউসুফ কারখানা বিভাগ থেকে ওএসডি করার অল্প কিছু দিন পর নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরও অদৃশ্য শক্তি ও বিরাট অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে আবারো পেল প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ ।
হ্নএ বিষয়ে গত ১ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেই প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ ইউসুফ রিজার্ভ থেকে গণপূর্ত ইএম বিভাগ-১৩ এ প্রাইজ পোস্টিং পদায়ন দেয়া হয়। এই ইউসুফ এতই ক্ষমতাধর যে এক মাসের ব্যবধানে আবার প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন।
হ্নএকাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোটা অঙ্কে এক মাসে মধ্যে ঢাকার দুইটি ওয়াকিং ডিভিশনে পদায়ন করা হয়। গণপূর্ত অধিদফতরে তিনি দুর্নীতি আর অদম্য লুটপাটের এক প্রকৌশলীরা অনুসরণ-অনুকরণ করে থাকেন। হ্নজানা গেছে, মো: ইউসুফ ভুয়া বিল ভাউচার পাশাপাশি প্রায় এক বছর ছিলেন নাজমা এন্টারপ্রাইজসহ আরো একটি ব্যবসায়িক ফার্মের ব্যানারে গত পাঁচ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রজেক্ট থোক বরাদ্দ ডিপোজিটওয়ার্ক ও স্বাস্থ্য খাতের লাভজনক কাজগুলো পরোক্ষ ঠিকাদারি ব্যবসাসহ একচেটিয়াা পার্সেন্টেজ বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন কম করে হলেও অর্ধশত কোটি টাকা। গত ৩১ জুলাই অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর এক আদেশে হাতে বদলি করা হলেও ডিভিশনাটিকে লুটপাটের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে কমপক্ষে তিন বছর। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
হ্নঅনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৌশলী ইউসুফ ডিজিশনটিতে থাকতে লুটপাটের সুবিধার্থে উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো কাজ ওটিএম না করে এলটিএম পদ্ধতিতে কাছের প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিয়েছেন। মোটা অঙ্কের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৯ লাখ ৮৩ হাজার ৬০৮ টাকা চুক্তিতে সোবাহানবাগে বাংলাদেশ ইননিটটিউট অব ম্যানেজমেন্টের ফোর্স ভেন্টিলেশন সিসেস্টম স্থাপন ট্রেন্টিং কমিশনিং কাজটি এলটিএম পদ্ধতিতে হোমল্যান্ড এজেন্সি নামে পাইয়ে দিয়েছেন। এই প্রকল্পে ফায়ার প্রোটেকশন ও এলার্নিং সিস্টেম অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থাস্থাপন এলইডি সাইনবোর্ড পিএবিএক্স ইন্টারকম সিস্টেম পিও কনফারেন্স সিস্টেম, ডিজিটাল কারপার্কিং কাজগুলো নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতির কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্টরা।
হ্নঅনুসন্ধান করে আরো দেখা যায়, একইভাবে এনবিআর ও বিটিআরসি প্রকল্পের সেন্ট্রাল এসি সিস্টেম লিফট গেট লাইট গার্ডেন লাইট বাউন্ডারি লাইট ব্র্যাকেট লাইট, এয়ারকুলার, সাবস্টেশন, সেন্ট্রাল এসি, ভিআরএফ সিস্টেম, মটরাইজড ও মডুলেটিং বাল্ব, সোলার প্যানেল সিস্টেম, পাম্প মোটর সেট, সার্জ প্রটেকশন ডিভাইস, জেনারেটর, ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল ইলেট্রিফিকেশন, এইচটি এলটি লাইন, সাবমেইন ক্যাবল, ডিজিটাল এলইডি সাইনবোর্ড ও ডিসপে সিস্টেম, নতুনভাবে গঠিত ই-ট্যাক্স ম্যনেজমেন্ট ইউনিটের কম্পিউটার ও অন্যান্য অফিস সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপন কাজসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক কাজগুলোতে শিডিউলবহির্ভূত ডিজাইন ও নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিম্নমাণের কাজ করিয়ে বড় অঙ্কের সরকারি বরাদ্দ লোপাট করেছেন। বিশেষ করে এনবিআর ও বিটিআরসি ভবনের সোলার প্যানেল উদ্বোধনের পর পরই অকার্যকর হয়ে যায় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন সেন্ট্রাল এসি ও লিফটের কাজে নিম্নমাণের চাইনিজ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করার কারণে উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিনিয়ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে এ ওই দু’টি ভবন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছে।
হ্নএ ছাড়াও জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর, পিএসসি, আবহাওয়া অধিদফতর, ন্যাশনাল আর্কাইভ ও লাইব্রেরি ভবন, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন * কেন্দ্র, ঢাকা এস্টক এক্সচেঞ্জ, ইপিবি ভবন, এসএমআরসি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ন্যাম ভবন, জাতীয় মানসিক হাসপাতাল, টিবি হাসপাতাল পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, কিডনি হাসপাতাল, পাসপোর্ট, এনআইএলজি, আগারগাঁও ও তালতলা স্টাফ কোয়ার্টার, সংসদ সচিবালয় কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনার বৈদ্যুতিক নির্মাণ মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ কাজে গত ৫ অর্থবছরে বিপুল অর্থ লুটপাট করেছেন প্রকৌশলী ইউসুফ।
হ্ননির্বাহী প্রকৌশলী ইউসুফ বর্তমান পরিবর্তিত অবস্থায় নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন একজন সাবেক শিবির ক্যাডার হিসেবে। অথচ তিনি চাকরি পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। আওয়ামী লীগের সময়ে সর্বমহলে নিজেকে পরিচয় দিতেন একজন প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হিসেবে। মুক্তিযোদ্ধা ও আ’লীগার হিসেবে স্বৈরাচার সরকারের সময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও সচিবালয়ে এসডিই হিসেবে দীর্ঘ দিন দায়িত্বে থেকে লুটপাটে হাত পাকিয়েছেন তিনি। তার সহকর্মীরা বলে থাকেন আসলে তিনি কোনো দলের নয়, চরম সুবিধাবাদী। সচিবালয়ে দায়িত্বে থাকতে তিনি একজন শ্রমিককে গাড়িচাপা দিয়ে মেরেছেন। সে বিষয়ে শাহবাগ থানায় ওই সময়ে মামলা হলেও বড় অঙ্কের টাকায় দফারফা করেন এই প্রকৌশলী।
হ্ননাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকৌশলী ইউসুফের আরেক সহকর্মী জানান, কখনো তিনি পীরসাব হুজুরের খানকার টাকা দেন, কখনো ফ্যাসিবাদী মন্ত্রীর অনৈতিক কাজের সহযোগী। হ্নআরো অভিযোগ রয়েছে, ডিভিশনটিতে থাকতে তিনি অফিসে বসতেন না। বাসা বিসিএফআইসিসি পিএসসি ইএম জোন অফিসসহ বিভিন্ন- স্থানে বসে ফাইলপত্র স্বাক্ষর করতেন এই প্রকৌশলী।
এ ছাড়া উন্নয়নমূল প্রকল্পের কাজে ৫ শতাংশ ও এপিপির কাজে ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ টাকা আদায়সহ ঠিকাদারের সিকিউরিটি থেকেও পার্সেন্টেজ আদায় করতেন এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী। ইতঃপূর্বে একজন ঠিকাদার পাওনা আদায়ে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দাখিল করেছিল। যা গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে উঠে এসেছিল। এরপর তড়িঘড়ি করে ওই ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করেছিলেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে প্রোকৌশলী ইউসুফকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।



