বিরোধ নিষ্পত্তিতে দুই বিধিমালা বিএসইসির

পুঁজিবাজারের পতন গড়াল টানা তৃতীয় দিনে

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পতনের ধারাবাহিকতা থেকে যেন বেরুতেই পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল বুধবার টানা তৃতীয় দিনের মতো দরপতনের শিকার ছিল দেশের দুই পুঁজিবাজার। আর এ ক’দিন বাজারগুলোর আচরণও ছিল অনেকটা একই রকম। প্রতিদিনই লেনদেনের শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী থাকা সূচক বিক্রয়চাপে পতনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আর এভাবেই পতন দিয়ে লেনদেন শেষ হয় বাজারগুলোর। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের সন্দেহই শেষ পর্যন্ত সত্যি হচ্ছে। কারণ এক দিন আগে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে ফের ধারাবাহিক পতনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৯ দশমিক ১৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৩৭৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৩৩৭ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে। এ নিয়ে গত তিন দিনে সূচকটি মোট ১০৯ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট হারাল। গতকাল ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৪১ ও ১২ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ৩৬ দশমিক ৩১ পয়েন্ট হারায়। ১৫ হাজার ৮২ দশমিক ৬১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে ১৫ হাজার ৪৬ দশমিক ৩০ পয়েন্টে স্থির হয়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২২ দশমিক ২০ ও ১৬ দশমিক ০৭ পয়েন্ট।

সূচকের টানা এ অবনতির প্রভাব ছিল বাজারগুলোর লেনদেনেও। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৬১১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৭৬ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৭৮৭ কোটি টাকা। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন নেমে আসে ৮ কোটি টাকায়। মঙ্গলবার সিএসইর লেনদেন ছিল ১২ কোটি টাকা।

এ দিকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সাথে স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার, ইস্যুয়ার কোম্পানির মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দুটি বিধিমালার অনুমোদন দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিধিমালা দুটি হলো- ‘ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (সেটেলমেন্ট অব ডিসপিউট) রেগুলেশনস, ২০২৫’ এবং ‘চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (স্যাটেলমেন্ট অব ডিসপিউট) রেগুলেশনস, ২০২৫’।

মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত ৯৭৬তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল বিএসইসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, কমিশন ‘ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (সেটেলমেন্ট অব ডিসপিউট) রেগুলেশনস, ২০২৫’ এবং ‘চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (স্যাটেলমেন্ট অব ডিসপিউট) রেগুলেশনস, ২০২৫’ ন্রম দু’টি বিধিমালার অনুমোদন দিয়েছে। বিধিমালা দুটি সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে পাঠানো হবে। স্টক এক্সচেঞ্জের উদ্যোগে সরকারি গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে তা কার্যকর করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, বিনিয়োগকারীদের সাথে স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার, ইস্যুয়ার কোম্পানিসমূহের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ বা অভিযোগ উল্লেখিত প্রবিধানমালার আওতায় মধ্যস্থতা ও সালিশির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যাবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের সাথে স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার, ইস্যুয়ার কোম্পানিসমূহের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধসমূহ জটিল ও সময়সাপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম ছাড়াই অধিকতর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি বা সমাধান সম্ভব হবে।

গতকাল ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতি দিনই মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে অবস্থান নেয়া দুর্বল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো আবার দরপতনের শিকার হচ্ছে। গতকাল ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল এ ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো। এ ছাড়া কিছু কিছু স্বল্প মূলধনী কোম্পানির টানা মূল্যবৃদ্ধিতে ছেদ পড়েছে। এগুলো এবার দরপতনের শিকার হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার উদ্যোগের কথা বাজারে চাউর হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যারা কলকাঠি নাড়ছিল তারা হাতের শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছে। অন্তত দু’টি কোম্পানি জিকিউ বলপেন ও কে অ্যান্ড কিউর দরপতন তারই ইঙ্গিত দেয়। এ দু’টি কোম্পানি সাম্প্রতিক সময়ে ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে যা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা যায়। কারণ যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই মৌলভিত্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এ দু’টি কোম্পানির লাগাম ছাড়া দর বাড়ছে অথচ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তার কোনো কারণ জানাতে পারছে না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি পিএলসি। ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১১ লাখ ২২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২০ কোটি ৫২ লাখ টাকায় ১৬ লাখ ৯৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ছিল দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি।

ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, কে অ্যান্ড কিউ, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স এবং সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ।

ডিএসইতে গতকাল দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে সাধারণ বীমা কোম্পানি পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে কোম্পানিটির। দর বৃদ্ধির এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল একই খাতের গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির শেয়ার দর ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিএসইতে দর বৃদ্ধির শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলো ছিল সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, নিটল ইন্স্যুরেন্স, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং এবং তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স।

এ দিন দরপতনের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি। এ দিন কোম্পানিটির শেয়ার দর আগের কার্যদিবসের তুলনায ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ কমেছে। দরপতনের এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। কোম্পানিটির শেয়ার দর ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমেছে।

ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলো ছিল এক্সিম ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট, কে অ্যান্ড কিউ এবং প্রিমিয়ার লিজিং ফাইন্যান্স।