যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর, দীর্ঘ বাণিজ্যযুদ্ধের প্রস্তুতি

Printed Edition

আলজাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক গতকাল মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা থমকে থাকায় শিগগিরই কোনো সমঝোতার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো।

নতুন পাল্টা শুল্কের আওতায় প্রায় দুই হাজার ৮০০ কোটি কানাডীয় ডলার বা দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য রয়েছে। ইস্পাত, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সুতির টি-শার্টসহ শত শত পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

প্রাথমিক তালিকায় তাজা মাছ ও লবস্টার থাকলেও স্থানীয় মৎস্যশিল্পের আপত্তির পর সেগুলো বাদ দিয়েছে কানাডা। দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে গিয়ে নিজেদের অর্থনীতির ক্ষতি এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত।

গত আগস্টের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ে। এরপর নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো অগ্রগতি হয়নি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন একটি ‘টেকসই’ চুক্তি চান তারা, যা দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা প্রস্তুত হলে আমরাও আলোচনায় বসে চুক্তি করতে প্রস্তুত।’

অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন কানাডাকে সর্বোত্তম প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নিলে কিছু কানাডীয় পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপও নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা বোম্বার্ডিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। উৎপাদন কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর না করলে প্রতিষ্ঠানটির সাথে সব ধরনের মার্কিন ব্যবসা বন্ধ করার হুমকি দেন তিনি। বর্তমানে কানাডার গাড়ি ও ট্রাকে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডীয় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠেও রয়েছে অতিরিক্ত শুল্ক। আগস্টের শেষ দিকে দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহল, হকি স্টিক ও পারফিউমসহ আরো কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।

এর জবাবে কানাডা ‘ডলার-ফর-ডলার’ পাল্টা শুল্ক আরোপের নীতি নিয়েছে। এর আগে উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণ না করা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ি ও ট্রাকেও পাল্টা শুল্ক বসিয়েছিল দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ফলে পাল্টাপাল্টি শুল্কের প্রভাব দুই দেশের ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপরই পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, কানাডার নতুন শুল্কের কারণে পোশাক, খাবার ও আসবাবপত্রের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সও সরকারকে সতর্কতার সাথে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ব্যবসায়ীরা পাল্টা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও ‘অন্তহীন উত্তেজনা’ চান না এবং দীর্ঘ বাণিজ্য বিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও কানাডার অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে এবং এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত এক লাখ ৮১ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে আগস্টে প্রায় ৪১ হাজার চাকরি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যনির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। জুলাইয়ে কানাডার মোট রফতানির ৬৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে গেছে, যা বাণিজ্যযুদ্ধের আগে গড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল।