জুলাই সনদ ও নাগরিক প্রত্যাশা নিয়ে সংলাপে বদিউল আলম মজুমদার

১৬ জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর হতে পারে

এবার সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে সংস্কার শব্দটি ক্রাইম হিসেবে গণ্য হবে : মনির হায়দার

Printed Edition
জুলাই সনদ ও নাগরিক প্রত্যাশা নিয়ে সংলাপে বদিউল আলম মজুমদার
জুলাই সনদ ও নাগরিক প্রত্যাশা নিয়ে সংলাপে বদিউল আলম মজুমদার

সরকার মাজহারুল মান্নান রংপুর ব্যুরো

জুলাই প্রক্লেমেশন এবং জাতীয় সনদ এক নয় উল্লেখ করে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, কাজ চলছে। আগামী মাসে ঐকমত্য কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আগামী ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদের শাহাদতের দিন জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য গঠন) জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনির হায়দার বলেছেন, এবার সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে সংস্কার শব্দটি ক্রাইম হিসেবে বিবেচিত হবে। এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা যেমন দ্রুত নির্বাচন করে ক্ষমতা রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দিতে চান, একই সাথে তিনি মিনিংফুল ইফেকটিভ ফান্ডামেন্টাল রিফর্মও করে দিতে চান।’

শনিবার ( ৩১ মে) বেলা আড়াইটায় রংপুরের আরডিআরএস মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর বিভাগ আয়োজিত জাতীয় সনদ ও নাগরিক প্রত্যাশাবিষয়ক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সুজন রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জুর সভাপতিত্বে ও হাঙ্গার প্রজেক্টের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজা শশাংক বরণ রায়ের সঞ্চালনায় এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন- প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য গঠন) জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনির হায়দারসহ রংপুর মহানগর ও এ বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলার সুজন প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা।

সাংবাদিক মনির হায়দার বলেন, ‘সংস্কার নিয়ে কাজ চলছে। এই সংস্কার শব্দটি ২০০৭-০৮ সালে গালি হিসেবে ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই শব্দটি মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আশাবাদী হিসেবে দেখা দিয়েছে। শব্দটি নিয়ে মানুষ আশাবাদী। এবার যদি আমরা সংস্কার করতে না পারি, আমরা যদি ব্যর্থ হই, তাহলে সংস্কার শব্দটি কিন্তু আর গালি থাকবে না। এটি অপরাধ বা ক্রাইম হিসেবে গণ্য হবে। আপনারা সবাই সেটির ভুক্তভোগী হবেন।’

মনির হায়দার বলেন, ‘ছয় কমিশনের রিপোর্টে হাজারো সুপারিশ আছে। সবগুলো তো আপনাদের সামনে আনা যায়নি। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস তাড়াতাড়ি নির্বাচন হোক এটা যেমন চান, তাড়াতাড়ি তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব দিয়ে চলে যেতেও চান। এই কথাটা আমাদের সবসময় বলেন, যে এটা আমি তাড়াতাড়ি শেষ করে দেবো। একই সাথে তিনি মিনিংফুল ইফেকটিভ ফান্ডামেন্টাল রিফর্ম করে দিতে চান। তার এই চাওয়াটার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ আছে। অল্প সময়ে বড় সংস্কার। এই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি।’

মনির হায়দার বলেন, ‘আমি আমার কথা বলার অধিকার বন্ধক রেখে সরকারের সাথে কিছু কাজ করছি। আমি বছরের পর বছর হাজারো বক্তব্য দিয়েছি। এই বক্তব্য দেয়ার মধ্য দিয়েই কি আমার কাজ শেষ হবে? আমাদেরকে সবসময় বলা হয়, বলা সহজ, করা কঠিন, করে দেখাও। আমাদেরকে তো এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। আমরা রিফর্ম প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছি। ওনারা কিছু করেছেন আমরা কিছু করেছি।’

মনির হায়দার বলেন, ‘সবকিছু কি আমরা রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেবো। আপনারাই করবেন। শুধু পলিটিশিয়ানরাই করবেন। আমাদেরকে তো এর মধ্যে ঢুকে দেখাতে হবে দেখতে হবে যে কাজটা কিভাবে হয়, আমরাও কিছু করতে পারি। আমরা সেই চেষ্টাটাই করছি। আমরা আমাদের কথা বলার অধিকারকে একপাশে রেখে, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের একধরনের স্বাচ্ছন্দ্য সুবিধা-অসুবিধাকে একপাশে রেখে আমরা এই কাজটা করছি। কারণ এটাই আমি মনে করি হওয়া উচিত। আমরা কথা বলেছি। একটা ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে আমরা একটু সিস্টেমে কন্ট্রিবিউট করার চেষ্টা করছি।’

সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘৭২-এর সংবিধান ছিল এক ব্যক্তির শাসনব্যবস্থাকেন্দ্রিক। শেখ হাসিনা কিন্তু ট্যাংকে চড়ে আসে নাই। উর্দি পড়ে আসেন নাই। শেখ হাসিনা কিন্তু সংবিধানও বাতিল করেন নাই। কিন্তু যে সাংবিধানিক বিধান ছিল, যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল, আইনি কাঠামো ছিল। সেগুলোই তাকে স্বৈরাচারী করেছে। তিনি আরো কিছু আইন পরিবর্তন করে, সংবিধান পরিবর্তন করে পঞ্চদশ সংশোধনী করে পুরো সংবিধানটাকে বদলে দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তার স্বৈরাচারী হওয়াটা আরো নিশ্চিত করেছে। সেই সংবিধানকে সংশোধন করে শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদের দানবে পরিণত হয়েছিল।’

বদিউল আলম বলেন, ‘ছাত্ররা, ওই আবু সাঈদরা প্রাণ দিয়েছিল। কারণ তারা মৌলিক কতগুলো পরিবর্তন চায়। মৌলিক কতগুলো সংস্কার চায়। সংস্কার ছাড়া যদি নির্বাচন হয়, তাহলে আমাদের আশঙ্কা থেকে যায়, আমরা আবারো পুরনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারি। আবারো আমাদের শাসক, যারাই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও তারা দানবে পরিণত হতে পারে। তো এই জন্যই সংস্কার প্রয়োজন। এই জন্যই আজকের এই আলোচনা।’

বদিউল বলেন, ‘এখন রাজনৈতিক দলগুলোও সংস্কারের কথা বলছেন। কেউ বেশি সংস্কারের কথা বলছেন, কেউ কম সংস্কারের কথা বলছেন, কেউ নীতিগতভাবে কতগুলো বিষয়ে একমত হচ্ছেন; কিন্তু বিস্তৃতভাবে আসতে গেলেই সেখানে অস্পষ্টতা আছে।’

ড. বদিউল বলেন, ‘এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ঐকমত্য কমিশনের আলাপ আলোচনা চলছে। আমাদের আকাক্সক্ষা হলো আগামী মাসের মধ্যে যেটা আজ (১ জুন) থেকে শুরু হবে। একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো। কতগুলো মৌলিক বিষয়ে, হাজারটা বিষয়ে নয়। যেখানে সংবিধান সংশোধন লাগবে। যেখানে সংসদ সদস্যদের, রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি লাগবে। যেখানে কতগুলো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাদের (রাজনৈতিকদলগুলোর) মতামত দরকার।’

সুজন সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘অনেকগুলো বিষয় আজকে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, সরকারের সাথে এবং ঐকমত্য কমিশনের সাথে। এগুলো সম্পর্কে যেন জনগণ সচেতন হয়, জনগণ যেন তাদের মতামত দিতে পারে। এগুলোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে লাগবে এবং সংবিধান সংশোধন হয়তো লাগবে। রাজনৈতিক দলের সাথে যে চুক্তি হবে, আমরা আশা করছি যে, আগামী মাসের মধ্যে এই চুক্তিটা হবে এবং এটা স্বাক্ষরিত হবে সে দিন, যে দিন আবু সাঈদ পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। যে দিন আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে বুলেট নিয়েছিল এবং শাহাদত বরণ করেছিল।’

এই মন্তব্য করার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে যান ড. বদিউল। তার দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। তিনি কিছুটা মুহূর্তে বাকরুদ্ধ থাকেন।

জুলাই প্রক্লেমেশন প্রসঙ্গে ড. বদিউল বলেন, ‘আমি মনে করি জুলাই প্রক্লেমেশন হলো একটি ঐতিহাসিক দলিল। এটা এবং জুলাই সনদ আলাদা। ২৪-এর জুলাই বিপ্লবকে ঐতিহাসিক এবং আইনি কাঠামো দিতে যথাসময়েই সেটি হওয়া প্রয়োজন। এটার সাথে জুলাই সনদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

ড. বদিউল আলম মজুমদার সুজনের সাধারণ সম্পাদক। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ছাড়াও ঐকমত্য কমিশনেরও একজন সদস্য।

সংলাপে রংপুর বিভাগ থেকে সুজন প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।