গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক হাদি গুলিবিদ্ধ

এভারকেয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ঁ মাথায় গুলি করে প্রশিক্ষিত কিলার

Printed Edition
সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদি :  নয়া দিগন্ত
সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদি : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক, ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। গতকাল জুমার নামাজের পর নির্বাচনী প্রচারণার জন্য বেলা ২টা ২৪ মিনিটে অটোরিকশায় বিজয়নগরের দিকে যাওয়ার সময় অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারীরা মোটরসাইকেলে পেছনে থেকে এসে তাকে গুলি করে। এ সময় তার সঙ্গীরা উদ্ধার করে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পর জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তার জন্য রক্তের ব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে প্রথমে জরুরি বিভাগের সিসিইউতে চিকিৎসা করান। পরে সিটি স্ক্যানে তার মাথায় গুলির অস্তিত্ব পাওয়ার পর দ্রুত অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় তার অপারেশন সম্পন্ন হয়। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এ দিকে ঘটনার পরপরই পুলিশ ও সিআইডি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানের পাশ থেকে ২টি গুলির খোসা উদ্ধার করে সিআইডি। গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে খোসাগুলো জব্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটির কর্মকর্তারা। তারা জানান, ওসমান হাদিকে রিভলবার দিয়ে গুলি করা হয়েছে। উদ্ধার করা গুলি ও খোসাগুলো ৩.২ বোরের, যা রিভলবারের গুলি বলে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা হাসপাতালে জড়ো হতে থাকেন। দেশজুড়ে প্রতিবাদ সমালোচনার ঝড় উঠে। এ ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেন দ্রুত হামলাকারীকে গ্রেফতারের জন্য।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, হামলাকারী প্রশিক্ষিত শুটার। হাদি যখন মতিঝিলের ছোট মসজিদ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন তখন থেকেই তাকে রেকি করে দুর্বৃত্তরা। এরপর রিকশায় উঠার পর মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা অবস্থায় দুইজন তার পিছু নেয়। বেলা ২টা ২৪ মিনিটে রিকশার খুব কাছ থেকে চলন্ত অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। তারপরও রিকশাটি অনেকটা দূর পর্যন্ত গিয়ে সাইট করে। ততক্ষণে সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। সূত্র আরো জানায়, গুলি করার আগে আরো দুইটা মোটরসাইকেল সামনের দিকে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, কিলারদের রক্ষা করতে আগে-পিছে তাদের নিয়োজিত করা হতে পারে।

হাদিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা মো: মিসবাহ জানান, জুমার নামাজের পর বিজয়নগর কালভার্ট রোড দিয়ে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী দুইজন তাকে মোটরবাইক থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তার বাম কানের পাশে এক রাউন্ড গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আরো জানান, ওসমান হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি সদর জেলার নলছিটি, ওই এলাকার শরিফ আব্দুল্লার সন্তান তিনি। পরিবার এলাকাতেই থাকেন।

এ দিকে হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর রাজধানীসহ সারা দেশে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় উঠে। তাকে দেখতে ঢামেক হাসপাতালে সমর্থক, সাধারণ মানুষ ও উৎসুক জনতার ভিড় বাড়তে থাকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও আনসার সদস্যরা।

শুক্রবার বিকেলে ঢামেক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দৃশ্য দেখা যায়। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে একের পর এক সেনাবাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করে ঢামেকে। এর আগে থেকেই পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। এ ছাড়াও রোগী ও জরুরি সেবা ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল : ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার দু’টি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ফুটেজে দেখা যায়, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে যাচ্ছিলেন হাদি। এ সময় ওই অটোরিকশাটির পিছু নেয় একটি মোটরসাইকেল। রিকশাটির ডান পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসা একজন হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এরপর মোটরসাইকেলটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২টা ২৪ মিনিটের দিকে গুলির শব্দ শোনা যায়। এর কয়েক সেকেন্ড পর একটি মোটরসাইকেলকে সড়ক দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থল রশি দিয়ে ঘিরে রাখে র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন।

যা বলেছেন চিকিৎসক : ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা: মোস্তাক আহমেদ জানিয়েছেন, ওসমান হাদিকে যখন জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয় তখন তার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক ছিল। পরে তাকে সিপিআর দেয়া হয়। বিকেল ৫টায় একটু প্রেসার ভালো দেখা গেছে। তবে তার মাথার ভেতরে গুলি ছিল। কানের পাশে গুলির চিহ্ন দেখা গেছে। পরে গুলিবিদ্ধ শরিফ ওসমান হাদিকে ‘লাইফ সাপোর্ট’ দেয়া হয়।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান সন্ধ্যায় বলেন, ওসমান হাদির মাথার ভেতরে গুলি আছে। অপারেশন থিয়েটারে সার্জারি চলছে। এর আগে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে হাদিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য মো: সারোয়ার বলেন, হাদি ভাই ও আমরা প্রতি শুক্রবার ঢাকা-৮ আসনের বিভিন্ন এলাকাতে নির্দিষ্ট করে মসজিদগুলোতে যাই এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালাই। সেই হিসেবে বিজয়নগর এলাকার কিছু মসজিদের তালিকা করা হয়। সেই তালিকা হাদি ভাই আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, তোমরা আজকেও এসব মসজিদে প্রচারণা চালাও। নির্বাচনী প্রচারণা শেষে আমরা এক সাথে লাঞ্চ করব। আর আমি একটি মসজিদে যাচ্ছি, সেখানে তোমাদের আসা লাগবে না, তোমরা এসো না। সকাল সাড়ে ১১টায় হাদি ভাইয়ের সাথে আমাদের সর্বশেষ এই কথা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের আরেক সদস্য ইসরাফিল জানান, বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণাকালে তাকে গুলি করা হয়। হাদি ভাই রিকশায় ছিলেন। মোটরসাইকেলে করে এসে দুর্বৃত্তরা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে বিস্তারিত এখন আর কিছু বলতে পারব না। সবার কাছে দোয়া চাই।

ওসমান হাদিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা মিসবাহ জানান, জুমার নামাজ পড়ে মতিঝিল বিজয়নগর কালভার্ট এলাকা দিয়ে রিকশায় করে যাওয়ার সময় দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে গুলি চালায়। গুলিটি তার বাম কানের নিচে লাগে। গুলি করেই তারা পালিয়ে যায়। এরপর ওসমান হাদিকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাই।

হাদিকে লাগাতার হত্যার হুমকি : গত নভেম্বর মাসে হাদি জানিয়েছিলেন, তিনি দেশী-বিদেশী ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পেয়েছেন। ১৪ নভেম্বর ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে বলেছিলেন, তাকে হত্যা, তার বাড়িতে আগুনসহ তার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হয়েছে। হাদি লিখেছিলেন, গত তিন ঘণ্টায় আমার নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশী নম্বর থেকে কল ও টেক্সট করেছে। যার সামারি হলো- আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।

গুলি করা সন্ত্রাসীদের ধরতে ডিএমপির সাঁড়াশি অভিযান : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক প্লাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা সন্ত্রাসীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো: সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন, ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন। ওনার অবস্থা খুবই গুরুতর। হাদির ওপরে গুলিবর্ষণকারীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা, র‌্যাবসহ সবাই কাজ করছে দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারের জন্য।

বিজয়নগর আসতেই মোটরসাইকেলের দু’জন গুলি করে : গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় শরিফ ওসমান হাদির পেছনের রিকশায় ছিলেন মো: রাফি। হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, জুমার নামাজ শেষে আমরা হাইকোর্টের দিকে আসছিলাম। রিকশায় ছিলাম। বিজয়নগরে আসতেই একটা মোটরসাইকেলে করে দু’জন এসে হাদি ভাইয়ের ওপর গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। আমি ভাইয়ের পেছনের রিকশায় ছিলাম।