ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ২৪টি কোম্পানির মাধ্যমে এস আলমসংশ্লিষ্টদের বেআইনিভাবে কেন্দ্রীভূত ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে দায়ের হওয়া রিটে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সাথে ওই ২৪টি কোম্পানির নামে থাকা ইসলামী ব্যাংকের এসব শেয়ার আগামী তিন মাসের জন্য ফ্রিজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরো (আইইআরবি) এ বিষয়ে রিট আবেদন করলে আদালত এ আদেশ দেন।
বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মো: লুৎফর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ গত ৩০ আগস্ট এ রুল জারি করেন এবং এ সংক্রান্ত লিখিত রায় প্রকাশ করা হয়। গতকাল শুক্রবার বিষয়টির বিস্তারিত জানান আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে আইনি পর্যায়ে গড়াল।
রিটে অভিযোগ করা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক ও ১৪খ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে ২৪টি কোম্পানির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক শেয়ার কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এসব শেয়ার ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।
১০ শতাংশের সীমা
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংকের শেয়ার মালিকানায় নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। একই ব্যক্তি, গ্রুপ বা পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মালিকানার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের সুযোগ না থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু রিটে দাবি করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত হয়ে সম্মিলিতভাবে ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
রিটকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এভাবে বিভিন্ন কোম্পানির নামে শেয়ার ধারণের মাধ্যমে আইনগত মালিকানা কাঠামোর আড়ালে একটি গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত শেয়ার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার রয়েছে। রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক শেয়ার নির্ধারিত সীমার বাইরে কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরও এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
তিন মাসের জন্য শেয়ার ফ্রিজ
রুল জারির পাশাপাশি হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪টি কোম্পানির নামে থাকা ইসলামী ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার তিন মাসের জন্য ফ্রিজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে এ সময় এসব শেয়ার হস্তান্তর, বিক্রি বা মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার কাঠামোয় নতুন কোনো পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকবে না- আদালতের আদেশের কার্যকারিতা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে ইসলামী ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক শেয়ার এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার ধারণের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ ওঠে। এবার সেই মালিকানা কাঠামো নিয়ে সরাসরি আদালতের হস্তক্ষেপের ফলে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেল।
নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন
ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক। ফলে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানির হাতে ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার কেন্দ্রীভূত থাকার অভিযোগ শুধু শেয়ার মালিকানার প্রশ্ন নয়; এর সাথে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ অনুমোদন, ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থের বিষয়ও জড়িত।
রিটে মূলত প্রশ্ন তোলা হয়েছে- আইনে যখন ব্যাংকের শেয়ার মালিকানায় সীমা নির্ধারণ করা রয়েছে, তখন কিভাবে এত বিপুল শেয়ার বিভিন্ন কোম্পানির নামে কেন্দ্রীভূত হলো এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
হাইকোর্টের রুলের মাধ্যমে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার মালিকানার বৈধতা আদালতের পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।
রিটে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তাকে বেআইনি ঘোষণা এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক(৩) অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
তবে রুল জারি হওয়া মানেই রিটে উত্থাপিত অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে- এমন নয়। আদালতের পরবর্তী শুনানি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের পর বিষয়টির আইনি নিষ্পত্তি হবে।
রিটকারীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন।



