প্রতিদিন ১৭০০ মেগাওয়াট উৎপাদনেও সিলেট অন্ধকারে

বৈষম্যের অভিযোগে ক্ষোভ

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো
Printed Edition

ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সিলেটবাসী। ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত নগরজীবন। তীব্র গরমে পুড়ছে গোটা সিলেট অঞ্চল। আর তার ওপর ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নাজেহাল জনগণ।

গতকাল রোববার বিকেল ৫টায় সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে- নগরীতে ১৯৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১২৫ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৭০ মেগাওয়াট। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতেও চলছে এলাকা ভিত্তিক লোডশেডিং। কোথাও কোথাও দিন-রাতে মিলিয়ে ২০ থেকে ২২ বার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার ঘটনা ঘটছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ কম পাওয়ায় এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কিন্তু তথ্য বলছে, সিলেট বিভাগের ৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই প্রতিদিন প্রায় ১৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে নিয়মিত। অথচ সিলেটের মোট চাহিদা ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াটের বেশি নয়। এ অবস্থায় স্থানীয়দের অভিযোগ- নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকেই বঞ্চিত সিলেটবাসী, যা ‘বিমাতাসুলভ আচরণ’ ছাড়া কিছু নয়।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নগরীর অনেক এলাকায় পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। রান্না, গোসল ও দৈনন্দিন কাজকর্মে ভোগান্তি বেড়েছে বহু গুণে। জালালাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, রোববার ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ১৫-১৬ বার লোডশেডিং হয়েছে। অনেক সময় টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশুসহ পরিবারের সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

একই অবস্থা বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, উপশহরসহ নগরীর প্রায় সব এলাকাতেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানপাটে বিক্রি কমে গেছে। ব্যাংক, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাহত হচ্ছে কাজ।

সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, বিদ্যুৎ ও উন্নয়ন বৈষম্যে সিলেটবাসী দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত। সড়ক যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত খাতে যেমন পিছিয়ে রাখা হয়েছে, বিদ্যুতেও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক (কুইক রেন্টাল) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্ভর নীতির কারণেই টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তারা মনে করেন, জ্বালানি খাতে অদক্ষতা ও স্বজনপ্রীতির ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন নাগরিকদের।

নগরবাসী বিলাল আহমদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, অথচ সেই বিদ্যুৎ অন্য অঞ্চলে পাঠিয়ে আমাদেরকেই রাখা হয় অন্ধকারে।’ তিনি অবিলম্বে সিলেটে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান।

এ বিষয়ে সিলেট পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ আব্দুল কাদির বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। রোববার ১২৫ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া গেছে, ঘাটতি ছিল ৭০ মেগাওয়াট।’ তিনি আরো জানান, ‘লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করা হয় কেন্দ্রীয়ভাবে; স্থানীয় কার্যালয়ের কিছু করার থাকে না। গরম বেশি থাকায় চাহিদাও বেড়েছে। তাপমাত্রা কমলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।’

তবে নাগরিকদের মতে, ‘তাপমাত্রা নয়, নীতির তাপেই জ্বলছে সিলেট।’ প্রতিদিন ১৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সত্ত্বেও চাহিদার অর্ধেকও সরবরাহ না পাওয়া- এ যেন নিজেদের ঘরে বসে আলো না জ্বালিয়ে অন্যের জানালায় বাতি ধরিয়ে দেয়া।