দ্য গার্ডিয়ান
গাজায় ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পর এবার লেবাননে প্রাকৃতিক পরিবেশকে যুদ্ধাস্ত্র বানাচ্ছে ইসরাইল। দক্ষিণ লেবাননের দমকলকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ওই অঞ্চলে দাবানল সৃষ্টি করছে। তাদের মতে ইসরাইলের বোমা হামলা ও ড্রোন হামলার কারণে বনাঞ্চল পুড়ে যাচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননের প্রাকৃতিক পরিবেশকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে ইসরাইল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর দাবানল সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরই অংশ।
মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের খিয়ামের বাইরে একটি বনাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনী ফ্লেয়ার নিক্ষেপ করার পর আগুন ধরে যায়। দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে গেলে কাছাকাছি এলাকায় ড্রোন হামলা চালায় ইসরাইল। নিরাপত্তার কারণে দমকলকর্মীদের সেখান থেকে সরে যেতে হয়। নাবাতিয়েহ অঞ্চলের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান হুসেইন ফাকিহ এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন আমাদের বেশির ভাগ অভিযানের উদ্দেশ্যই আগুন নেভানো। ইতোমধ্যে বিশাল বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। সঠিক পরিসংখ্যান নেই, তবে ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি এলাকাগুলোর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ১৭ জুন হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরাইলি সেনাদের কার্যক্রম থেমে নেই। প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও দক্ষিণ লেবাননে প্রায় প্রতিদিনই আগুন ও দাবানলের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে জলপাইবাগান ও কৃষিজমিতে এসব আগুন লাগছে। দমকলকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পোস্ট করা ভিডিও এবং আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট। দাবানলের বিষয়ে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। ফাকিহ আরো বলেন, যুদ্ধবিরতির পরপরই তারা এসব শুরু করেছে। প্রতিদিন অগ্নিসংযোগকারী বোমা ব্যবহার করছে। ছোট ড্রোন এসে দাহ্যপদার্থ ফেলে যায়। বনাঞ্চলে সাদা ফসফরাসের গোলা ছোড়া হয়। দিনের বেলায় আলোকসৃষ্টিকারী ফ্লেয়ারও ফেলা হয়, যাতে গাছপালায় আগুন ধরে যায়।
দক্ষিণ লেবাননের অন্যান্য এলাকার দমকলকর্মী ও বাসিন্দারাও একই অভিযোগ করেছেন। শুক্রবার কাফারচৌবা এবং জেজিন ও পশ্চিম বেকা উপত্যকার মধ্যবর্তী দু’টি ঘন বনাঞ্চলে ইসরাইলি গোলাবারুদের কারণে বড় ধরনের দাবানল সৃষ্টি হয়। কাফারচৌবার বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্রের প্রধান সামির হারদান জানান, শুক্রবার বিকেলে একটি ড্রোন বনাঞ্চলে গোলাবারুদ ফেললে আগুন ধরে যায়। শনিবার আগুন নেভানোর পর রোববার আরেকটি ড্রোন সেখানে পুনরায় আগুন লাগায়।
দমকলকর্মীদের কার্যক্রম পরিচালনার আগে লেবাননের সেনাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করতে হয়। সেনাবাহিনী সেই অনুরোধ ইসরাইলি বাহিনী ও সঙ্ঘাত এড়ানোর সমন্বয়কারী দলের কাছে পাঠায়। তবে আগুন নেভানোর জন্য মাত্র দু’টি স্থানে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। অন্যান্য এলাকায় আগুন জ্বললেও সেখানে যাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব আগুন লেবাননের পরিবেশের ওপর ইসরাইলি হামলার ধারাবাহিকতার অংশ। এর ফলে দেশটির বনাঞ্চল ও সেখানকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। লেবাননের পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠন গ্রিন সাদার্নার্সের প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস বলেন, এগুলো দীর্ঘদিনের বনাঞ্চল। এখানে ওকগাছের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল স্টোন পাইনগাছও রয়েছে। এই এলাকা পরিযায়ী পাখিদের চলাচল ও বিশ্রামের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেস এসব হামলাকে ‘পরিবেশহত্যা’ আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, ইসরাইল ধারাবাহিকভাবে গোলাবারুদ, আগুন ও রাসায়নিক ব্যবহার করে দক্ষিণ লেবাননের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে।
২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইল বারবার লেবাননের বনাঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী অতীতে দাবি করেছে, হিজবুল্লাহ তাদের যোদ্ধা ও সুড়ঙ্গ আড়াল করতে এসব বনাঞ্চল ব্যবহার করে। তবে পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আগুন ও পরিবেশ ধ্বংসের এসব কর্মকাণ্ড বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরাইলের সেনারা মধ্যযুগীয় নিক্ষেপযন্ত্র ‘ট্রেবুশে’ ব্যবহার করে লেবাননের সীমান্ত দেয়ালের ওপর দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ ছুড়েছিল। একই সময়ে লেবাননের সেনাবাহিনী কিছু ইসরাইলের ড্রোনের ছবি প্রকাশ করে, যেগুলোতে বনাঞ্চলে দাহ্যপদার্থ ছড়ানোর জন্য পাইপ যুক্ত করা ছিল। ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরাইলের উড়োজাহাজ দক্ষিণ লেবাননের কৃষিজমিতে আগাছানাশক ছড়িয়েছে। ওই রাসায়নিকের সাথে ক্যানসারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে।
১ আগস্ট সীমান্তবর্তী ইয়ারুন গ্রামের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা দেখতে পান, ইসরাইলের সেনারা তাদের জলপাই ও ফলের বাগানসহ বাড়িঘরেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সীমান্তের কাছে খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রমেইচ ও আইন এবেলের বাসিন্দারাও আগুনের ছবি পাঠিয়েছেন। ইয়ারুনের মেয়র হাফেজ ঘাশাম বলেন, তারা ইতোমধ্যে পুরো গ্রামটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এরপর গাছগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই এলাকায় শুধু জলপাইগাছগুলোই অবশিষ্ট ছিল, যেখানে অনেক পুরনো জলপাইগাছ ছিল। সেখান থেকেই আগুন শুরু করে। পরে আগুন গ্রামের প্রান্তজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।


