- ১২টি রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে
- ২০২২ সালের হিসাবে ব্যয় ৩.৩৭ লাখ কোটি টাকা
- কিলোমিটারে ২ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা
উচ্চাভিলাষী খরচে মেগা প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের করা সার্ভে অনুযায়ী রাজধানী ঢাকা শহরে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে। তবে এখন চারটি রুটে ১২৮.১৪ কিলোমিটার নির্মাণে খরচ হবে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৭ কোটি ছয় লাখ টাকা, যা প্রতি কিলোমিটারে দুই হাজার ৬২৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা ২৫ কোটি ডলারের বেশি। তবে যখন টেন্ডার আহ্বান করা হবে তখন ব্যয় আরো বৃদ্ধি পাবে। মোট ব্যয় প্রায় দেশের একটি বাজেটের সমান ব্যয় হবে। এমনকি উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। তবে গড়ে প্রতি কিলোমিটারে খরচ যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, ফ্রান্স ও চীনের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকা শহরের সাবওয়ের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের তথ্য হলো, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা শহরে সাবওয়ে নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ২০২২ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনে ১২টি রুটে মোট ২৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। এই চারটি রুটে ব্যয় তিন লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৭ কোটি ছয় লাখ টাকা হবে ২০২২ সালের হিসাব মতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারটি রুটের দৈর্ঘ্য হলো ১২৮.১৪ কিলোমিটার। স্পেনের প্রতিষ্ঠান টেকনিকা ওয়াই প্রয়েক্টোস এসএ (টিওয়াইপিএসএ)-র নেতৃত্বে জাপানের পিএডিইসিও ও বিসিএল অ্যাসোসিয়েটস যৌথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা করেছে।
রুট চারটি হলো : রুট শূন্য- ঢাকা শহরের টঙ্গী থেকে মহাখালী এবং সদরঘাট হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত সাবওয়ে রুট। এটি নির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এ রুটের দৈর্ঘ্য ৩৪.৯২ কিলোমিটার। মোট স্টেশন সংখ্যা ২৪টি। এটি নির্মিত হলে ঢাকা শহরের উত্তর অংশ থেকে দক্ষিণ অংশে যাতায়াত সহজ হবে। এ ছাড়া এ রুট নির্মিত হলে মেট্রো-৬ এবং মেট্রো-২-এর উপযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
রুট বি : ঢাকা শহরের গাবতলী থেকে বিসিএসএওএইচএস (ঢেলনা) পর্যন্ত সাবওয়ে রুট ‘বি’ নির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এ রুটের দৈর্ঘ্য ২২.৮৯ কিলোমিটার। মোট স্টেশন সংখ্যা ১৪টি। এটি নির্মিত হলে ঢাকা শহরের পশ্চিম অংশ থেকে পূর্ব অংশে যাতায়াত সহজ হবে। গাবতলীতে মেট্রো-২ এবং মেট্রো-৫-এর লাইন থাকবে। এ ছাড়া সাবওয়ের ‘বি’ রুট মেট্রো-৬ এবং মেট্রো-১-এর সাথে সংযুক্ত হবে।
রুট এস : ঢাকা শহরের কেরানীগঞ্জ থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত সাবওয়ে রুট ‘এস’ নির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এ রুটের দৈর্ঘ্য ২৫.২২ কিলোমিটার। মোট স্টেশন সংখ্যা ১৫টি। এটি নির্মিত হলে ঢাকা শহরের পূর্ব অংশ থেকে পশ্চিম অংশে যাতায়াত সহজ হবে। এ ছাড়া এ রুট নির্মিত হলে মেট্রো-৬ এবং মেট্রো-২-এর উপযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। আর রুট ‘টি’ : নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরা সেক্টর-১৬ পর্যন্ত সাবওয়ে রুট ‘টি’ নির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এ রুটের দৈর্ঘ্য ৪৫.১১ কিলোমিটার এবং মোট স্টেশন সংখ্যা ৩২টি। এটি নির্মিত হলে নারায়ণগঞ্জ শহরের সাথে ঢাকা শহরের উত্তর অংশের যাতায়াত সহজ হবে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে মেট্রো-৪-এর লাইন সংযুক্ত হবে।
প্রতি রুটের ব্যয় : রুট শূন্য- ঢাকা শহরের টঙ্গী থেকে মহাখালী এবং সদরঘাট হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত সাবওয়ে রুট। এ রুটের দৈর্র্ঘ্য ৩৪.৯২ কিলোমিটার। ২৪টি স্টেশনসহ রুট নির্মাণ ব্যয় হবে ৯৭ হাজার ১৫৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। ফলে এখানে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ দুই হাজার ৭৮২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
রুট বি : ঢাকা শহরের গাবতলী থেকে বিসিএসএওএইচএস (ঢেলনা) পর্যন্ত সাবওয়ে নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার ২৭৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এখানে ২২.৮৯ কিলোমিটার সাবওয়েসহ মোট স্টেশন সংখ্যা ১৪টি। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে দুই হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
আর ঢাকা শহরের কেরানীগঞ্জ থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত সাবওয়ে এস রুটের দৈর্ঘ্য ২৫.২২ কিলোমিটার। মোট স্টেশন সংখ্যা ১৫টিসহ নির্মাণ খরচ মোট ৬২ হাজার ১৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে দুই হাজার ৪৬৬ কোটি টকা। এ ছাড়া রুট ‘টি’ : নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরা সেক্টর-১৬ পর্যন্ত সাবওয়ের দৈর্ঘ্য ৪৫.১১ কিলোমিটার এবং মোট স্টেশন সংখ্যা ৩২টি। এটার ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ২১ হাজার ১৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এখানে কিলোমিটারে খরচ পড়ছে দুই হাজার ৬৮৬ কোটি পাঁচ লাখ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও চীনের সাথে তুলনা : বিভিন্ন দেশের সাথে তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে সাবওয়ে বা পাতাল রেল নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়, যা সাধারণত প্রতি কিলোমিটারে ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলারের (প্রায় এক হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা) বেশি হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে (যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স) খরচ সবচেয়ে বেশি, যা ২৫ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে প্রতি কিলোমিটারে খরচ। অন্য দিকে চীন বা এশিয়ার অনেক দেশে তুলনামূলক খরচ কম। এখানে প্রায় এক কোটি থেকে সাত কোটি ডলারে নির্মাণ করা সম্ভব হয় প্রতি কিলোমিটার সাবওয়ে। এ দিকে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিসে প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি হতে পারে। এখানে নিউ ইয়র্কের সেকেন্ড অ্যাভিনিউ সাবওয়েতে কিলোমিটার প্রতি খরচ ১৩০ থেকে ১৬০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
মধ্যম থেকে উচ্চ ব্যয়ে রয়েছে দুবাই ও সিউল। দুবাই সাবওয়ে মেট্রোতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর সিউলের সাবওয়ে মেট্রোর নির্দিষ্ট লাইনে চার কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে আট কোটি ৭০ লাখ ডলার গড়ে খরচ হয়েছে। আর কম ব্যয়ে চীন করেছে। কাজের পরিধি ও উন্নত প্রযুক্তির কারণে চীনে প্রতি কিলোমিটারে এক কোটি থেকে তিন কোটি ডলার খরচ হয়েছে। তবে তা প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী ৫৭ কোটি ১০ লাখ পর্যন্তও হতে পারে।
প্রকৌশলী বিশ্লেষকরা বলছেন : সেতু বিভাগের বিশ্লেষকরা বলছেন, সুড়ঙ্গ বা মাটির উপরে, সুড়ঙ্গ বা আন্ডারগ্রাউন্ড নির্মাণ ব্যয় মাটি বা এলিভেটেড পথের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া শহরের ঘনত্বও একটি কারণ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কাজের জটিলতা ও ভূমি অধিগ্রহণে খরচ বাড়ে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা, ব্যবহৃত প্রযুক্তির মান, সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যয়ের প্রধান কারণ। আর বাংলাদেশের এই প্রকল্প যখন শুরু হবে তখন পণ্যের দাম বিবেচনায় খরচ বাড়তে পারে।



