ভারতের পুশইনকে কেন্দ্র করে সীমান্তে সঙ্ঘাতের শঙ্কা

সম্প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যের আইনসভায় ঘোষণা দিয়েছেন, যাকেই বিদেশী হিসেবে শনাক্ত করা হবে, তাকে সরাসরি বাংলাদেশে পুশইন করা হবে।

এস এম মিন্টু
Printed Edition
সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন
সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন |ফাইল ফটো

- কলকাতার বাংলাভাষী মুসলিমদেরও পুশইনের টার্গেট বিজেপি নেতাদের

- দুই দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জোরালো পদক্ষেপ নেয়া জরুরি

- আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য উসকানিমূলক

- গত ৩৪ দিনে মোট ১২৪২ জনকে পুশইন

ভারত থেকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানো (পুশইন) কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তে বসবাসকারীদের মধ্যে সঙ্ঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যের আইনসভায় ঘোষণা দিয়েছেন, যাকেই বিদেশী হিসেবে শনাক্ত করা হবে, তাকে সরাসরি বাংলাদেশে পুশইন করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের আইনি অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এমন হুমকির পর সীমান্ত এলাকায় সঙ্ঘাতের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং ওই দেশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ওপারের গ্রামবাসীদের এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে ওই সূত্র জানায়।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দ্বন্দ্বের জেরে বিজেপি নেতারা বাংলাদেশকে চাপে রাখতে পুশইন করছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত বাংলাভাষীদের (মুসলমান) তুলে নিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দিচ্ছে। যার ফলে কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশীদেরও টার্গেট করে পুশইনের পরিকল্পনা করছে বিজেপি নেতারা। বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত থেকে জোরপূর্বক ঠেলে যেসব মানুষকে যে প্রক্রিয়ায় পাঠানো হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মানবাধিকার লঙ্ঘন। কোনো আইন-কানুন না মেনে নিয়ম বহির্ভূূতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পুশইন করছে ভারত। এমনকি উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বড় আকারে যা করা দরকার সেটা হলো, প্রথমে দুই দেশের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা। আমাদের দেশে যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে তারা বসে আছে কেন। তারাও তাদের কাউন্টার পার্টকে ভালো করেই চেনে। তবে সরকারকে বসা দরকার। সরকার যদি সহায়তা দেয় তাহলে আরো ভালো হয়। কাউকে ধরে জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছে এটা এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। সে ক্ষেত্রে ভারতের নামীদামি মানবাধিকারকর্মীদের সাথে বসা দরকার। দুই দেশের মিডিয়া, ব্যবসায়ীরা বসে আলোচনা করতে হবে। আমরা যদি বসে থাকি তাহলে তো এটার সমাধান হবে না। ভারতে যারা দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করে আসছে তারা তাদেরকে অল্প মূল্যে শ্রম দিয়ে আসছে। এতে করে তাদের এমনিতেই কিছু অধিকার তৈরি হয়। আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনীতির কারণে বাংলাদেশে পুশইন করার কথা বলেছে। কারণ এগুলো বললে সে ভোট বেশি পাবে। তার বক্তব্য মূলত এক ধরনের উসকানিমূলক।

একাধিক মানবাধিকারকর্মী নয়া দিগন্তকে বলেন, এখানে মানবাধিকারকর্মীদের তেমন কোনো কাজ নেই। এই সঙ্কট দূর করতে হলে রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গত সোমবার আইনসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে রাজ্যের জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের একটি পুরনো আইন আবার কার্যকর করা হয়েছে, যার বৈধতা স্বয়ং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বীকৃতি দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এ ছাড়া, যেসব ব্যক্তিকে রাজ্যের ফরেনার ট্রাইব্যুনাল বিদেশী ঘোষণা করেছে, তাদের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে ফরেনার ট্রাইব্যুনালের আদেশের ভিত্তিতে প্রায় ৩৫০ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর যেসব ব্যক্তি আসামে প্রবেশ করেছেন, তারা ভারতের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন না। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন।

রায়ে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর আসামে যারা প্রবেশ করেছেন, তাদের কোনো ধরনের ছাড় বা ব্যতিক্রম দেয়ার সুযোগ নেই। আদালত নির্দেশনা দেয়, ১৯৫০ সালের পুশইন-আইনও বৈধ, এবং সেই আইনের আওতায় জেলা প্রশাসকরা চাইলে যে কাউকে পুশইন করতে পারবেন। আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে না।

আসামে দীর্ঘদিন ধরে এনআরসি এবং নাগরিকত্ব নিয়ে আন্দোলন করছেন কমল চক্রবর্তী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যেভাবে নতুন করে ধরপাকড় শুরু হয়েছে, তা আইনসম্মত নয়। আর রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়া কোনো সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না।’

গত ৩ জুন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মানুষকে ঠেলে পাঠানো (পুশইন) অব্যাহত রেখেছে ভারত। এটি বন্ধে ভারত সরকারকে চিঠি দেবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া এই সমস্যা সমাধানে কনস্যুলার পদ্ধতির (কনস্যুলার ডায়ালগ) আওতায় ভারতের সাথে কাজ করতে চায় ঢাকা।

তিনি বলেন, পুশইন ঠেকানো সম্ভব নয় স্বীকার করে তৌহিদ হোসেন বলেন, পুশইন হচ্ছে, ফিজিক্যালি এটি ঠেকানো সম্ভব নয়। এটা নিয়ে ভারতের সাথে আমাদের চিঠি আদান-প্রদান হচ্ছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, গত ৭ মে থেকে এখন পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে ১৩২ জন, সিলেট সীমান্ত দিয়ে ১১৫ জন, মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে ৩৮০ জন, হবিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ৪১ জন, সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ১৬ জন, কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ১৩ জন, ফেনী সীমান্ত দিয়ে ৫২ জন, কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ৯৩ জন, লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়ে ৮৫ জন, ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ২২, ঠাকুরগাঁও সীমান্ত দিয়ে ৩২ জন, পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে ৫৫ জন, দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে ১৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ২৫ জন, কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে ৯ জন, মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ৩০ জন, চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৯ জন, ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ৫২ জন এবং সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ২৩ জন, এ ছাড়া সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের মান্দারবাড়িয়া এলাকায় ৭৮ জনকে পুশইন করা হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ৩২ জনকে পুশইন করেছে ভারত। তার মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে ৭ জন, দিনাজপুরে ১৩ জন ও মেহেরপুরে ১২ জন। গত ৩৪ দিনে মোট ১২৪২ জনকে পুশইন করেছে ভারত।