কারসাজির মাধ্যমে উত্থানের মাশুল দিচ্ছে এসএমই কোম্পানিগুলো

শেয়ার বাজার

কারসাজিনির্ভর শেয়ারদর বৃদ্ধির যে উত্থান একসময় এসএমই বোর্ডকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, তার মাশুল এখন গুনতে হচ্ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে। মৌলভিত্তি ও আয়ের সক্ষমতা ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠা এসএমই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় দরপতন দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। ফলে বাজারমূল্য ও পুঁজিবাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

শাহ আলম নূর
Printed Edition
কারসাজির মাধ্যমে উত্থানের মাশুল  দিচ্ছে এসএমই কোম্পানিগুলো
কারসাজির মাধ্যমে উত্থানের মাশুল দিচ্ছে এসএমই কোম্পানিগুলো

কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার উথানের মাশুল দিচ্ছে এসএমই কোম্পানিগুলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারসাজিনির্ভর শেয়ারদর বৃদ্ধির যে উত্থান একসময় এসএমই বোর্ডকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, তার মাশুল এখন গুনতে হচ্ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে। মৌলভিত্তি ও আয়ের সক্ষমতা ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠা এসএমই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় দরপতন দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। ফলে বাজারমূল্য ও পুঁজিবাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জল্পনা ও কারসাজিনির্ভর অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিণতি হিসেবে ২০২৫ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এসএমই বোর্ড বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছে। বছরের ব্যবধানে এসএমই সূচক ২২ শতাংশ কমেছে, যা মূল বোর্ডের তুলনায় অনেক বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মৌলভিত্তি ও আয়ের সক্ষমতা ছাড়াই যে দাম বেড়েছিল, তার সংশোধন অবশ্যম্ভাবী ছিল।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসএমই বোর্ডের ২০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ১৬টিরই বাজারমূল্য কমেছে। এসব কোম্পানির অনেকগুলোর শেয়ারদরে আগের বছরগুলোতে অস্বাভাবিক উত্থান দেখা গিয়েছিল, যার পেছনে কোনো শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি বা ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন ছিল না। এর ফলেই চলতি বছরে একের পর এক শেয়ারদরে বড় সংশোধন হয়েছে।

২০২৫ সাল শেষে এসএমই সূচক ২৩৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫৬ পয়েন্টে, যা বোর্ড চালুর সময় নির্ধারিত ১ হাজার পয়েন্টের ভিত্তিমূল্যেরও নিচে। এর বিপরীতে, একই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে

তথ্যে দেখা যায় ডিএসইর এসএমই বোর্ড চালু হয় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তখন মাত্র ছয়টি কোম্পানি নিয়ে যাত্রা শুরু করে বোর্ডটি, যার ভিত্তি সূচক নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার পয়েন্ট। মূল উদ্দেশ্য ছিল ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ করে দেয়া।

কিন্তু চালুর অল্প সময়ের মধ্যেই বোর্ডটি জল্পনামূলক বিনিয়োগকারীদের নজরে পড়ে। ২০২২ সালের আগস্টে এসএমই সূচক সর্বোচ্চ দুই হাজার ২৪৪ পয়েন্টে ওঠে, যা ছিল সম্পূর্ণভাবে অস্বাভাবিক। সে সময় অনেক এসএমই কোম্পানির শেয়ারদর কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যদিও আয়, লভ্যাংশ কিংবা ব্যবসার পরিধিতে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উত্থান ছিল মূলত গুজবনির্ভর লেনদেন ও সীমিত শেয়ারের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু বিনিয়োগকারীর কারসাজির ফল।

তথ্যে দেখা যায় ২০২৫ সালে এসে সেই জল্পনাভিত্তিক উত্থানের মূল্য দিতে শুরু করে এসএমই বোর্ড। বছরের বিভিন্ন সময়ে এসএমই শেয়ারগুলোর দর ৬ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর ফলে এসএমই বোর্ডের মোট বাজার মূলধন ৪ বিলিয়ন টাকারও বেশি কমে গিয়ে বছরের শেষে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন টাকায়।

রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা প্রধন আকরামুল আলম বলেন, এসএমই কোম্পানিগুলোর মূল সমস্যা হলো পুঁজি ও উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। বড় পরিসরে সম্প্রসারণ বা স্কেলআপ করার মতো মূলধন তাদের নেই, ফলে আয় ও মুনাফা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ানো কঠিন।

তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব এসএমই খাতের আয় ও মুনাফায় পড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে অনেক এসএমই কোম্পানির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমেছে, যা স্বাভাবিকভাবেই শেয়ারদরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে পতিত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর এসএমই সূচকের পতন আরো ত্বরান্বিত হয়। বাজারে ধারণা তৈরি হয়, নতুন গঠিত সিকিউরিটিজ কমিশন আগের তুলনায় শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। সেই আশঙ্কায় অনেক জল্পনাভিত্তিক বিনিয়োগকারী বাজার ছাড়তে শুরু করেন। এর আগেই এসএমই বোর্ডে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কয়েকটি ছোট মূলধনের শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় এসএমই বোর্ডের সবচেয়ে আলোচিত শেয়ারগুলোর একটি হিমাদ্রি। উত্তরাঞ্চলে ছয়টি আলুর হিমাগার পরিচালনাকারী এই কোম্পানিটি একসময় এসএমই সূচক বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে প্রতিষ্ঠানটিরশেয়ারদরে বড় ধাক্কা লাগে। গত বছরের শেষে হিমাদ্রির শেয়ারদর ৫৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬৫৭ টাকা ৯০ পয়সায়। অথচ ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে এর দাম প্রায় ১০ হাজার টাকায় উঠেছিল, যা বাজার বিশ্লেষকদের বিস্মিত করেছিল। সে সময় অনেক লাভজনক ও নিয়মিত লভ্যাংশ দেয়া ব্লু-চিপ কোম্পানির শেয়ারদরও হিমাদ্রির চেয়ে অনেক কম ছিল।

এ দিকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে হিমাদ্রির শেয়ার কারসাজির অভিযোগে এক ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক কোটি ৭০ লাখ টাকা জরিমানা করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। ব্যাপক দরপতনের পরও হিমাদ্রির শেয়ার এখনো অতিমূল্যায়িত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি দরপতনের শিকার হয়েছে ওরাইজা অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। মাছ ও পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনকারী এই কোম্পানির শেয়ারদর ৬৫ শতাংশ কমে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় নেমে এসেছে। একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা ৩১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকায়।

অন্য দিকে ইউসুফ ফ্লাওয়ার মিলস নামে আরেকটি এসএমই শেয়ার বছরের শেষে ৮৬ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২০০ টাকায় দাঁড়ালেও বিশ্লেষকরা এটিকে সম্পূর্ণ কৃত্রিম উত্থান বলে মনে করছেন। ২০২৪ সালের জুনে শেয়ারটির দর একসময় ৬ হাজার ৩৫২ টাকায় উঠেছিল। অথচ ২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির মুনাফা ৪৩ শতাংশ কমেছে এবং মাত্র ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসএমই বোর্ডের বর্তমান পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মৌলভিত্তি বিবেচনা না করে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার আশায় বিনিয়োগ করলে শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তবে নতুন সিকিউরিটিজ কমিশন বাজারে আস্থা ফেরাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা, দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসএমই বোর্ডের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি, নিয়মিত আর্থিক প্রকাশ এবং কঠোর নজরদারি। এ ছাড়া জল্পনাভিত্তিক লেনদেন আবারো বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।