ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশে বইতে শুরু করেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের হাওয়া। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ- সব স্তরেই ডামাডোল বাজতে শুরু করেছে। যদিও এখনো নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা হয়নি, তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি, সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপি-সহ সব দলই পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে হাট-বাজার আর অলিগলি। আইন সংশোধনের ফলে এবার দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় প্রতিটি দলেই একাধিক প্রার্থী তৎপরতা চালাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও নির্বাচনের ক্ষণগণনা
বিগত ৫ মে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বছরের মধ্যে সব স্তরে নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এর কয়েক দিন পরই ৯ মে এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয় সরকারের উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচন হতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর এটি স্পষ্ট যে, আসন্ন ঈদুল আজহার পরপরই নির্বাচনী আমেজ চূড়ান্ত রূপ নেবে।
দীর্ঘ দেড় দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় নেতাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না’।
তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন : অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হিংসা ও গ্রুপিং অনতিবিলম্বে দূর করতে হবে। প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর নির্ভর না করে জনগণের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল কাটা কর্মসূচি এবং হেলথ কার্ডের মতো সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজগুলো প্রচার করতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করতে চাই। বিগত বছরগুলোতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমরা সেই ক্ষত সারাতে বদ্ধপরিকর।’
জামায়াতে ইসলামী : সংহত সাংগঠনিক প্রস্তুতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সাংগঠনিক প্রস্তুতির দিক থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। দলটির দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কাঠামো ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মী নেটওয়ার্ক তাদের প্রস্তুতিকে আরো সুসংহত করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ উপজেলায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি অনানুষ্ঠানিক তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘নির্বাচনী সেল’ গঠন করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে আরো সক্রিয় ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে সহায়তা করছে। এসব সেলের মাধ্যমে ভোটার যোগাযোগ, জনসংযোগ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, দলটি কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনের সময়কে কেন্দ্র করে নয়; বরং সারা বছরই সাংগঠনিক প্রস্তুতির মধ্যে থাকে। তার ভাষায়, ‘আমরা সারা বছরই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিই। আমাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত আছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক সাংগঠনিক কার্যক্রম, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা জামায়াতকে নির্বাচনী প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত অবস্থানে রেখেছে।
এনসিপি তারুণ্যের চমক দেখাতে চায় : জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের একটি বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দলটি তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে সংগঠিতভাবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানিয়েছেন, এনসিপি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘আমরা ক্লিন ইমেজের শিক্ষিত তরুণ, ছাত্রনেতা ও সমাজে গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্বকে মনোনয়ন দিতে চাই’।
দলীয় নেতাদের মতে, গ্রামগঞ্জের ভোটারদের পাশাপাশি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণনির্ভর এই কৌশল সফল হলে এনসিপি নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
আওয়ামী লীগ : কৌশলী ও নীরব অবস্থান : ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতৃত্ব এখনো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়নি। দলীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো নির্বাচনী প্রস্তুতি না থাকলেও বিভিন্ন এলাকায় সাবেক জনপ্রতিনিধিরা স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছেন বলে জানা যায়।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনি জটিলতা এবং সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে দলটি এখনো প্রকাশ্য নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান কৌশলগত ও অপেক্ষামূলক, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
নীরব প্রতিযোগিতা ও আগামীর বার্তা : মাঠের সমীকরণ বলছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি ‘নীরব প্রতিযোগিতা’ তৈরি হচ্ছে। এক দিকে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, অন্য দিকে জামায়াতের সুশৃঙ্খল কর্মিবাহিনী- উভয় পক্ষই স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বজায় রাখতে চায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ‘ব্যক্তিগত ভাবমর্যাদা’ এবং ‘জনপ্রিয়তা’ বড় হয়ে উঠবে। দীর্ঘ সময় পর একটি প্রভাবমুক্ত ও উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে আছেন সাধারণ ভোটাররা। স্থানীয় পর্যায়ের এই ভোটের ফলাফলই মূলত আগামীর জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।



