ময়মনসিংহ অফিস
গতকাল ২৫ মে ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। কবির জন্মজয়ন্তী দেশজুড়ে উদযাপিত হলেও তার স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে গড়ে ওঠা নজরুল স্মৃতিকেন্দ্রটি বছরের বেশির ভাগ সময় পড়ে থাকে অযতœ ও অবহেলায়। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের অভাব এবং যাতায়াতের নাজুক রাস্তার কারণে দিন দিন কমছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯১৪ সালে ভারতের আসানসোলের একটি রুটির দোকানে কাজ করার সময় কিশোর নজরুলের সাথে পরিচয় হয় রফিজউল্লাহ দারোগার। কবির প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে ময়মনসিংহে নিয়ে আসেন এবং ত্রিশালের কাজীর শিমলায় নিজের বাড়িতে রাখেন। প্রথমে দারোগাবাড়িতে থাকলেও পরে পড়াশোনার সুবিধার্থে নজরুলকে দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। প্রতিদিন প্রায় সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যাওয়া কষ্টসাধ্য হওয়ায় তিনি নামাপাড়ার বিচুতিয়া বেপারীর বাড়িতে জায়গির হিসেবে থাকতে শুরু করেন। সেখানকার পুকুরপাড়ের একটি ছোট ঘরেই কাটে কবির শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
কবির এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় ‘নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র’। এখানে এখনো রয়েছে কবির ব্যবহৃত কাঠের খাট, পুরনো গ্রামোফোন, দেয়ালজুড়ে হাতে লেখা কবিতা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব মূল্যবান নিদর্শন। এমনকি যে বটগাছের নিচে বসে কবি সাহিত্যচর্চা করতেন, সেটিও এখন চরম অযতেœ পড়ে আছে। এক সময় দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও বর্তমানে স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব না জেনে অনেকেই আসেন শুধু ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে।
বিচুতিয়া বেপারি পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, স্মৃতিকেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য তারা জমি দিলেও বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো খোঁজ নেয় না। এমনকি নজরুলের নামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্যও তারা স্বল্পমূল্যে জমি দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
ঐতিহাসিক এই স্মৃতিকেন্দ্রে যাওয়ার সড়কটির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে দর্শনার্থীদের আগ্রহ যেমন কমছে, তেমনি বৃষ্টির দিনে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
স্মৃতিকেন্দ্রের পরিচালক ফয়জুল্লাহ রোমেল জানান, এখানে কবির গান ও কবিতা সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। কেবল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষেই নয়, সারা বছরই নজরুলের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা- সব প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত কবির স্মৃতিচিহ্নগুলো রক্ষা করা হোক।



