বাণিজ্য কৌশল ও মিয়ানমারে শান্তির খোঁজে শুরু এবারের আসিয়ান সম্মেলন

রয়টার্স
Printed Edition

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা এবারের আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে এক দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিতে বিশ্ব বাণিজ্যে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা কাটানোর উপায় যেমন খুঁজবেন তেমনি গৃহযুদ্ধ থামাতে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে আলোচনায় বসাতে আরেকটি চেষ্টাও করে দেখবেন। সপ্তাহান্তে মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের পর গতকাল সোমবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে জোটের এবারের শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমস্যা আসিয়ান অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সমস্যা। ২০১৭ সালে সরকারের দমন পীড়নে জর্জরিত হয়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এখনো তারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এ সমস্যার সমাধান এখনো বাকি। তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ জোরদার করতে সম্মত হয়েছেন আসিয়ান নেতারা। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, বিশ্বের পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতার মধ্যে আসিয়ান নেতারা এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য জোরদার করার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ এবং ৪৬তম আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন এবং সংশ্লিষ্ট শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা এই বিষয়ে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, একতরফা এবং সুরক্ষাবাদী প্রবণতা, বিশেষ করে পরাশক্তিগুলোর দ্বারা।”

আসিয়ান বিজনেস অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (আসিয়ান-বিএসি) ইন্টারফেসে তার উদ্বোধনী ভাষণে আনোয়ার বলেন, “সুতরাং আমাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিস্থাপকতাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং আজ সকালে আসিয়ান নেতাদের মধ্যে এই ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে, অবশ্যই, বাকিদের সাথে আলোচনা করাই সমাধান।”

আনোয়ার আরো বলেন, ৪৬তম আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন এবং সংশ্লিষ্ট শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত সব রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন যে আন্তঃআসিয়ান বাণিজ্য “সীমিত” করার কোনো কারণ নেই।

আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে নেতারা মিয়ানমার আর বাণিজ্য কৌশল- মূলত এই দুটো বিষয় নিয়েই কথাবার্তা বলবেন বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ধারণা দেয়া হয়েছে। ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির বেসরকারি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনী শাসনকর্তার আসনে বসার পর থেকে দেশটিতে তুমুল অস্থিরতা বিরাজ করছে।

প্রথমে গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলন, সেখানে সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের পর বিরোধীদের অনেক গোষ্ঠী অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। আগে থেকে সশস্ত্র লড়াইয়ে থাকা একাধিক জাতিগত গোষ্ঠীর সাথে তাদের সমঝোতা হওয়ার পর মিয়ানমারের জান্তাকে অনেক ফ্রন্টে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। চলতি বছরের আসিয়ান সভাপতির দায়িত্বে থাকা মালয়েশিয়া বলেছে, বিবদমান সব পক্ষকে সরাসরি আলোচনায় বসানোর চেষ্টায় তারা জান্তা এবং মিয়ানমারের সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সাথে আলাদা আলাদাভাবে কথা চালিয়ে যাবে।

“এই আলোচনা অনেকবার করে যেতে হবে যেন সব পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করা যায়,” শনিবার মিয়ানমারে সঙ্ঘাত নিয়ে দু’টি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এমনটাই বলেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামেদ হাসান। আগামী মাসে তার মিয়ানমার সফরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারে আসিয়ানের স্থায়ী দূত নিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় রাজি হয়েছেন বলেও তিনি জানান।

“আমরা এটি নিয়ে ভাবছি। বিষয়টি হলো- কে হবেন সেই বিশেষ দূত, যার হয়তো তিন বছরের মতো মেয়াদ থাকবে,” বলেন মোহামেদ। ২০২১ সালে মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটির জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে আসিয়ান সম্মেলন থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক দিন আগে বলেছেন, এবারের শীর্ষ সম্মেলনে তার দেশ মিয়ানমারের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রস্তাব দেবে তার দেশ।

গত মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে মিন অং হ্লাইংয়ের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছিলেন, একদিন পর তিনি মিয়ানমারের ছায়া ন্যাশনাল ইউনিটি সরকারের (এনইউজি) সাথেও অনলাইনে কথা বলেন। এই দুই বৈঠকের পর মিয়ানমারে শান্তি আলোচনা নিয়ে আশাবাদ পুনর্জাগরিত হয়।

মিয়ানমারের জান্তা চাইছে, এ বছরের শেষ দিকে দেশটিতে একটি নির্বাচন আয়োজনের। কিন্তু সমালোচকরা বলছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে ওই নির্বাচন হলে শেষ পর্যন্ত তাতে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বই বহাল থাকবে, প্রক্সিদের দিয়ে তারাই ক্ষমতা চালাবে। ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের কয়েক মাস পর আসিয়ান মিয়ানমার নিয়ে ‘৫ দফা ঐকমত্যের’ শান্তি পরিকল্পনা হাজির করলেও তা কার্যকর করা যায়নি। জান্তার নির্বাচনী পরিকল্পনা নিয়ে জোটের অবস্থান কী হবে তা নিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি।

আসিয়ান নেতাদের মঙ্গলবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের নেতাদের সাথেও সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির কারণে বিশ্ববাজারে দেখা দেয়া চরম অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বৈঠক হতে যাচ্ছে।

মার্কিন প্রশাসনের নতুন এ সিদ্ধান্তের কারণে ছয়টি দক্ষিণ-পূর্ব দেশকে জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে ৩২ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক গুনতে হবে। অবশ্য এ নিয়ে দেশগুলোর সাথে ওয়াশিংটনের আলোচনাও চলছে। আলোচনা সফল হলে শুল্কের পরিমাণ কমতেও পারে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া শীর্ষ সম্মেলনের আগে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেছেন, আসিয়ান নেতারা শুল্ক নিয়ে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তুলনা করে দেখবেন।

“বাণিজ্য বিষয়ে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে, আমাদের বিভিন্ন সদস্য দেশের ভিন্ন, ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যেই এ ব্যাপারে একমত হওয়ার পথ খুঁজতে হবে,” বলেছেন তিনি। আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগর নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা। বাণিজ্যের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার বিরোধ দিন দিন বাড়তে দেখা যাচ্ছে।