রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে

এইচআরএসএসের মানবাধিকার সম্মেলনে বক্তারা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ১২তম জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তে প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্ত, বিচার এবং জবাবদিহিতার অভাব দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঊসঢ়ড়বিৎ ণড়ঁঃয, ঝবপঁৎব জরমযঃং প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, বিচারক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, বিভিন্ন জেলার মানবাধিকার প্রতিনিধি এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।

দিনব্যাপী সম্মেলনে এইচআরএসএসের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাদা আল আমিন কবিরের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য ও সংগঠনের পরিচিতি তুলে ধরেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। সংগঠনের ২০২৫ সালের কার্যক্রম পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন প্রোগ্রাম অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম। ডকুমেন্টেশন অফিসার আব্দুল কাদের বাংলাদেশের বার্ষিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। একই পর্বে প্রোগ্রাম অফিসার সানী কুদরত সাকী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ বিষয়ক মনিটরিং প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন : ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মো: নূর খান, সানজিদা ইসলাম এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকারে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি ও পুলিশের গুলিতে পা হারানো সাতক্ষীরার রুহুর আমিন বক্তব্য দেন। অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজন, আহত আন্দোলনকারী এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা বলেন, বিচারহীনতা কেবল একটি আইনি সঙ্কট নয়; এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দুর্ভোগের কারণ। তারা সত্য উদঘাটন, স্বাধীন তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, নির্যাতনবিরোধী জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে টেকসই মানবাধিকার সুরক্ষা সম্ভব নয়।

পরবর্তী অধিবেশনে ‘সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া সীমান্তে নিহতদের পরিবারের সদস্য ফেলানী খাতুনের বাবা নুর ইসলাম ও নিহত মুরসালিনের বড় ভাই ইয়াসিন মিয়া তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।