এপিসির ওপর নিথর ইয়ামিন, দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
এপিসির ওপর নিথর ইয়ামিন, দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
এপিসির ওপর নিথর ইয়ামিন, দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সাভারের ব্যাংক টাউনের সেই বাড়িটিতে সময় যেন চব্বিশের ১৮ জুলাই হয়ে থমকে আছে। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন আর কোনো দিন দরজা খুলে ঘরে ফিরবেন না; এই বাস্তবতা আজও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকা স্বজনদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে তরুণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রাণ দিলেন, তার হত্যার বিচার কত দূর এগোল? পরিবারের ভাষ্য, শুধু শোক নয়, তারা এখনো অপেক্ষায় আছে ন্যায়বিচারের। এমন একটি বিচারের, যা কেবল ইয়ামিনের জন্য নয়, জুলাইয়ে প্রাণ হারানো সব শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতারও প্রতিফলন হবে।

যেভাবে শহীদ হয় ইয়ামিন

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাকিজা পয়েন্টে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দেন এমআইএসটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন। দুপুরের দিকে আন্দোলনস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় একটি এপিসি (আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। আরেকজন আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখে ইয়ামিন ধারণা করেন, গাড়িটির ওপর উঠে ঢাকনা বন্ধ করতে পারলে গুলিবর্ষণ থামানো সম্ভব হতে পারে। সেই উদ্দেশ্যে তিনি এপিসির ওপর উঠলে খুব কাছ থেকে তার বাম বুকে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি এপিসির ওপরেই লুটিয়ে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তাকে সাথে সাথে হাসপাতালে নেয়া হয়নি। আহত অবস্থায় এপিসিটি কয়েক দফা চলাচল করে এবং একপর্যায়ে তার নিথর দেহ গাড়ির ওপর থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়। পরে স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিনের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ইয়ামিন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় মুখে পরিণত হন। ইয়ামিনের মৃত্যুর পর তার লাশ দাফন নিয়েও পরিবারকে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাভারের ব্যাংক টাউন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

পরিবারের বর্তমান অবস্থা

ইয়ামিনকে হারানোর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে সেই শোক আজও যেন প্রথম দিনের মতোই তাজা। বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে তারা এখনো সেই শূন্যতা বয়ে বেড়াচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সময় কেটে গেলেও সন্তানের মৃত্যু মেনে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ইয়ামিনের বাবা মো: মহিউদ্দিন বলেন, শারীরিকভাবে তারা ভালো থাকলেও মানসিকভাবে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। তার ভাষায়, জুলাইয়ের শহীদ পরিবারগুলোর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু বক্তব্যও তাদের মানসিক কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়।

পরিবারের দাবি, জুলাইয়ের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় শহীদ পরিবারের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ইয়ামিন হত্যামামলার অগ্রগতি নিয়েও পরিবার আশাবাদী নয়। তাদের বিশ্বাস, বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র তার জবাবদিহি ও সুশাসনের পরিচয় দিতে পারে।

পরিবারে এখন খুব একটা ইয়ামিনের প্রসঙ্গ তোলা হয় না। কারণ, সেই আলোচনা শুরু হলেই নেমে আসে নীরবতা। ইয়ামিনের একমাত্র বোন বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, ইয়ামিনের মা আজও যেন বিশ্বাস করতে চান, ছেলে কোথাও আছে এবং একদিন ফিরে আসবে। এমনকি প্রয়োজন হলেও তার বোন ভাইকে মৃত বলে লিখতে পারেন না।

পরিবারের দাবি

ইয়ামিনের বাবা মো: মহীউদ্দিন বলেন, রাষ্ট্র যদি বিচার নিশ্চিত করতে অনীহা বা নিষ্ক্রিয়তা দেখায়, তাহলে ভুক্তভোগীদের চাওয়া-পাওয়ার তেমন কিছু থাকে না। বিচার চাওয়াটাও তখন ভুক্তভোগীদের সাথে এক ধরনের প্রতারণার শামিল হয়ে যায়।

ইয়ামিন হত্যা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলার কী হলো, কী হলো না- এসব নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। রাষ্ট্র চাইলে বিচার করবে, না চাইলে করবে না। রাষ্ট্রের সততা ও সুশাসন প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। তার ভাষায়, তাদের সন্তানরা ত্যাগের বিনিময়ে একটি পরিবর্তন এনে দিয়ে গেছে। এখন সেই পরিবর্তনের সুফল বাস্তবায়নের দায়িত্ব যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের। তারা যদি সেই দায়িত্ব পালন করে, সেটিই তাদের কৃতিত্ব হবে; আর না করলে সেটিও ইতিহাস মনে রাখবে। তিনি আরো বলেন, আমি বিচার আল্লাহর কাছে চেয়েছি, মানুষের কাছে নয়।