ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে জাতীয় সংসদ ও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারো উত্তপ্ত হতে পারে। সদ্য যাত্রা শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকা এবং রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশের আইনি বৈধতা প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখন ক্রমেই তীব্র আকার হচ্ছে। ঈদের আগে সংসদে উত্থাপিত এসব ইস্যু ছুটির পর আরো বিস্তৃত পরিসরে আলোচনায় আসবে- এমন আভাস মিলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এক দিকে সরকার সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে অগ্রসর হওয়ার কথা বলে অনড় অবস্থানে, অন্য দিকে বিরোধী দল গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত ‘জুলাই সনদ’ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে সংসদ ও রাজপথ- উভয় ক্ষেত্রেই মুখোমুখি অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন মুলতবি থাকলেও সংসদে উত্থাপিত ইস্যুগুলো এখন দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রশ্নগুলো ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের ছুটি শেষে আগামী ২৯ মার্চ ফের সংসদ বসবে। ওই অধিবেশনে এই বিতর্ক আরো তীব্র হয়ে উঠবে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সনদ বাস্তবায়নে সংসদের ভেতরে যেমন চাপ সৃষ্টি করবেন, তেমনি রাজপথের আন্দোলনেও দেখা যেতে পারে। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোট ঈদের পরে সংসদের বাইরেও কর্মসূচি দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। গত ১৫ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলাকালে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের ভূমিকায় প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি, যা জনগণের প্রত্যাশার প্রতি অবহেলার শামিল।
তিনি সংসদে উল্লেখ করেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো অধিবেশন ডাকা হয়নি। তার ভাষায়, এটি কেবল প্রশাসনিক বিলম্ব নয়, বরং জনগণের রায়ের প্রতি উপেক্ষা।
ডা: শফিকুর রহমান যুক্তি দেন, যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন, একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানও সম্ভব। তার মতে, এটি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন, যা সাংবিধানিক ব্যাখ্যার আড়ালে বিলম্বিত করা হচ্ছে।
তবে বিরোধী দলের এই দাবির বিপরীতে সরকার ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে বলেছেন, সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে রাষ্ট্রপতিকে এমন কোনো পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দেয়া সাংবিধানিকভাবে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সংবিধানে যার অস্তিত্ব নেই, তা নিয়ে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কোনো সাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতে পারেন না।
‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই আদেশকে ‘না অধ্যাদেশ, না আইন- মাঝামাঝি একটি বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করে এর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায় না। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিরোধী দল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে বলছে, রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশ সংবিধান অনুযায়ী আইনের মর্যাদা পায়। জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেছেন, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশও আইনের অন্তর্ভুক্ত। অতীতে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা এখনো কার্যকর রয়েছে। ফলে বর্তমান আদেশকে আইন হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ার সুযোগ নেই। মাসুদ সাঈদী এমপি বলেন, গণভোটে বিপুল সমর্থন পাওয়া ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে বিলম্ব জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে এই সনদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও এখন তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।
এ দিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানান, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ এবং গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশের কিছু ধারা নিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে রুল জারি হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন বিচারাধীন। তিনি বলেন, আদালতের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সংসদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে সংসদ এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যা পরে আদালতে গিয়ে অসাংবিধানিক হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে। যদিও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার মতো আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বিএনপি জনরায়কে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। কিন্তু, এটা বুমেরাং হবে।
সংসদের ভেতরের এই বিতর্কের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও উত্তাপ বাড়ছে। ঈদের ছুটিতে নেতারা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন এবং অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি এখন তৃণমূলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, দলীয় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে সরকার বলছে, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে এই ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ দিকে, সম্প্রতি রাজধানীতে ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন দ্রুত আহ্বান না করা হলে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হলেও এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়নি, যা জনগণের প্রত্যাশার সাথে সাংঘর্ষিক।
১১ দলের সমন্বয়ক বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিলেও সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে বিলম্ব করা হচ্ছে।
ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে লিখিতভাবে অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দেয়ার কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত এই পদক্ষেপ না নিলে বিরোধী দলগুলো জনগণের প্রত্যাশা রক্ষায় রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
১১ দলীয় সূত্র জানায়, আগামী ২৮ মার্চ জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হতে পারে। একই সাথে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ ও প্রশাসনে দলীয়করণের বিষয়ও রাজনীতির মাঠে গড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের পরবর্তী সময়টি দেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংসদের ভেতরে সাংবিধানিক বিতর্ক এবং বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি- এই দুই ধারার সমন্বয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। সরকার ধীর গতিতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলছে, সেখানে বিরোধী দল দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি তুলছে।



