- এক মাসের সাফল্য নিয়ে মাঠে সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রীরা
- বিরোধীদের ইস্যু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা ও দলীয় প্রশাসক নিয়োগ
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ বা ২১ মার্চ (শুক্র বা শনিবার) ঈদ উদযাপনের অপেক্ষায় দেশের কোটি কোটি মানুষ। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দীর্ঘ ছুটি। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলো ফাঁকা করে নাড়ির টানে গ্রামে ফিরছেন মানুষ। কিন্তু এই স্বজনমুখী যাত্রার ভেতরেই নীরবে জমে উঠেছে আরেক বাস্তবতা- তৃণমূলে সরব হয়ে উঠেছে রাজনীতি। সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই প্রথম ঈদ, আর সেই কারণেই উৎসবের আবহের সাথে মিশে গেছে নতুন ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ, প্রতিশ্রুতির মূল্যায়ন এবং বিরোধী রাজনীতির চাপ সৃষ্টির কৌশল। সরকারি দল তাদের এক মাসের সাফল্য তুলে ধরতে মাঠে নামছে, আর বিরোধী দল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা চালাবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
গতকাল থেকে শুরু হওয়া ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে সড়ক, রেল ও নৌপথে। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোতে উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ছে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর পরিবার-পরিজনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের পথে ছুটছেন কর্মজীবী মানুষ। তবে এই যাত্রা শুধু আবেগের নয়, বরং অনেকাংশে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক যোগাযোগেরও একটি বড় উপলক্ষ। কারণ, একই সময়ে রাজধানীর রাজপথ যখন ফাঁকা, তখন জেলা-উপজেলা ও গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান, বাজার আর পাড়া-মহল্লাই হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০৯টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গত ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন সংসদের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্য দিকে, প্রথমবারের মতো শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী, যারা ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসীন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র ও তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সাথে জোট করে ৬টি আসনে জয় পেয়েছে। খেলাফত মজলিস ও এলডিপিসহ এই জোট এখন ১১ দলীয় জোট হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয়।
এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই এসেছে ঈদুল ফিতর। ফলে এটি কেবল ধর্মীয় উৎসবের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন ও জনসংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক অগ্রগতি তুলে ধরতে মাঠে নেমেছে। দলের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতারা ঈদ উপলক্ষে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি সরকারের এক মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খাল খনন কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলোকে সামনে এনে তারা বোঝাতে চাইছেন, নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
সরকারি দলের নেতারা বিভিন্ন ঈদগাহ ময়দান, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসব বিষয় তুলে ধরছেন বা ধরবেন। সংসদ অধিবেশন শেষে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই এখন এলাকায়। তাদের বক্তব্যে উঠে আসছে- এই সরকার শুধু ক্ষমতায় আসার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। তারা সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলছেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঈদের সময়টিকে কাজে লাগিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটির জামায়াত ৬৮ জন সংসদ সদস্য এবং এনসিপির ছয়জন এবং দুই খেলাফত মজলিসের তিনজন সংসদ সদস্য নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন। তাদের সাথে জোটের অন্য দলগুলোর নেতারাও মাঠে নেমেছেন। মোট ৭৭ জন সংসদ সদস্য এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিএনপি সরকার এখন তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গত ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য তাদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বিরোধী শিবিরের দাবি, সংবিধানের দোহাই দিয়ে গণভোটে বিপুল সমর্থন পাওয়া একটি সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব করা মানে জনরায়কে অগ্রাহ্য করা। তাই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি তারা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন এবং করবেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় বর্তমান সরকার যথেষ্ট কার্যকর নয়।
অন্য দিকে, ঈদের এই সময়টিতে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তুলেছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও। সামনে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন থেকেই সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে শোভা পাচ্ছে তাদের পোস্টার ও ব্যানার। অনেকে ঈদের শুভেচ্ছার মাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি বাড়াচ্ছেন, আবার কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় পর্যায়ের এই তৎপরতা মূলত নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের সময় সরাসরি প্রচারণা না থাকলেও এটি ‘সফট ক্যাম্পেইন’-এর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কারণ, এই সময় মানুষ নিজ এলাকায় অবস্থান করে এবং স্থানীয় নেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পায়।
এ দিকে, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি বিরোধী রাজনীতির মাঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসব নিয়োগের মাধ্যমে সরকার স্থানীয় নির্বাচনকে প্রভাবিতের চেষ্টা করছে। ফলে এই বিষয়টিও এখন ঈদ আড্ডা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে অনুদান বিতরণ, দরিদ্রদের সহায়তা, ঈদ উপহার প্রদান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনও এখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে উঠেছে। সব দলের নেতারাই এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের আদর্শ তুলে ধরছে এবং জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্য দিকে, বিএনপি নেতারা এসব সমালোচনার জবাবে বলছেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতি ও কৃষি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তারা দাবি করছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জনগণ খুব শিগগিরই এর সুফল ভোগ করতে পারবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের এই সময়টি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক ধরনের পরীক্ষার সময়। কে কতটা জনসম্পৃক্ত হতে পারছে, কার বক্তব্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে- এসব বিষয় যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এটি। ফলে প্রতিটি দলই চেষ্টা করছে এই সময়টিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ শুধুই আনন্দ-উৎসবের নয়, এটি হয়ে উঠেছে রাজনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। মানুষের ঘরে ফেরা, পারিবারিক মিলন আর সামাজিক বন্ধনের পাশাপাশি তৃণমূলে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সমীকরণ। সরকারি দলের উন্নয়ন প্রচেষ্টা আর বিরোধী দলের চাপ সৃষ্টির রাজনীতি- এই দুইয়ের টানাপড়েন ঈদের পর আরো তীব্র হয়ে সংসদ ও রাজপথে প্রতিফলিত হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



