ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল, খালি জাল নিয়ে ফিরছেন জেলেরা

Printed Edition

এইচ এম হুমায়ুন কবির কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। অথচ কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় নদ-নদীতে কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা মিলছে না। ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা সাগর ও নদীতে গেলেও অনেকেই ফিরছেন প্রায় খালি জাল নিয়ে। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলে, আড়তদার ও ক্রেতারা। মাছের সরবরাহ কম থাকায় ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক ও দেশীয় মাছের দামও বেড়েছে।

মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, এই সময়ে মহিপুর মৎস্য বন্দরে ইলিশের আমদানি-বেচাকেনায় ব্যস্ততা থাকার কথা। কিন্তু এবার তার উল্টো চিত্র। স্বল্প পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ায় বাজারে সরবরাহ কম। চাহিদা থাকলেও বেশি দামের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের অনেকেই ইলিশ কিনতে পারছেন না। আশাখালী বাজার এলাকার জেলে রহিম ব্যাপারি বলেন, ‘মাছ কম ধরা পড়ায় অনেক জেলে নদীতে কম যাচ্ছেন। এক নৌকায় ছয়জন জেলে সারারাত নদীতে থেকে ১১ হাজার টাকার মাছ পেয়েছি। জ্বালানি, খাবার ও নৌকার মালিকের অংশ দেয়ার পর জনপ্রতি পেয়েছি প্রায় ৭০০ টাকা।’

মাছ বিক্রেতা নবীর হোসেন বলেন, এ সময়ে ইলিশ বিক্রিতে বাজার সরগরম থাকার কথা। কিন্তু এবার ইলিশের সরবরাহ খুবই কম। দিন দিন বেচাকেনার ব্যস্ততাও কমছে।

স্থানীয় বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের ইলিশ প্রতি মণ ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা, মাঝারি আকারের প্রতি মণ প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং বড় আকারের ইলিশ সর্বোচ্চ প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের দামও বেড়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, মোহনায় পলি ও ডুবোচর সৃষ্টি, মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, দূষণ এবং অবৈধভাবে মাছ আহরণ, সব মিলিয়ে ইলিশের স্বাভাবিক অভিবাসন ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে এর পুরো জীবনচক্র ও অভিবাসনপথ বিবেচনায় নিতে হবে। সাগর থেকে নদীতে আসার পথে নির্বিচারে মাছ ধরা, অবৈধ ও ছোট ফাঁসের জাল এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে অনেক ইলিশ প্রজননের সুযোগ পাওয়ার আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, চর ও পলি জমা, নদী দখল ও দূষণও ইলিশের চলাচল ও প্রজনন পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। মা ইলিশ ও জাটকা নিধন অব্যাহত থাকায় প্রজননক্ষম মাছ কমার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ইলিশের মজুদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাগর থেকে নদী পর্যন্ত পুরো অভিবাসনপথ সুরক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ও সাগরে অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে মাছ আহরণ করা হয়। এতে মাছের রেণু ও ছোট মাছ নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি নদ-নদীতে নিষিদ্ধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারেও পোনা ও ছোট মাছ নিধন হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, নদ-নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের প্রবেশে বাধা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি চায়না দুয়ারিসহ অবৈধ জালের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জাল জব্দ ও ধ্বংসে জেলা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।

তবে মৎস্য কর্মকর্তারা আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে আসা এবং বৃষ্টিপাত বাড়লে নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হবে। তখন সাগর থেকে ইলিশ নদীতে ফিরে আসতে পারে।

ক্রেতা রনি আলী বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে এখন ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে মাছের সরবরাহ কম থাকায় দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার মতে, অবৈধ জাল ও সাগরে অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।