- দুই হাজার ১৭৩টি স্কিমের ৪৮৮টির কাজই শুরু হয়নি পৌনে ৬ বছরে
- সমীক্ষা ছাড়াই শুরু, মাঝপথে থমকে দুর্যোগ পুনর্বাসন প্রকল্প
জলবায়ু দুর্যোগ আম্ফানের ক্ষত শুকায়নি, থমকে আসছে পুনর্বাসন কাজ। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েই শুরু হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি। কিন্তু পাঁচ বছর পর সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন বলছে, সেই পুনর্বাসন কার্যক্রমই থমকে আছে পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রশাসনিক ধীরগতি ও নিম্নমানের বাস্তবায়নের জালে। বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই নেয়া প্রকল্পের ২২ শতাংশ বা ৪৮৮টি স্কিমের কাজ পৌনে ৬ বছরেও শুরু হয়নি। এক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় ৯২ শতাংশ বাড়লেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। অন্য দিকে, নিম্নমানের নির্মাণ, অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি এবং দুর্বল তদারকির চিত্র উঠে এসেছে। ৩০ কোটি ১২ লাখ টাকার বেশি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়েছে বলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পান্না কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের এই বিকাশমান অর্থনীতির পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশের একটি বড় দুর্যোগ হলো ঘূর্ণিঝড়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৭ এবং ২০০৯ এ সিডর-আইলার পর ২০১৩-২০১৬ সালে নার্গিস, কোমেন এবং রোয়ানু উল্লেখযোগ্য বড় ঘূর্ণিঝড়। ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু বাংলাদেশের কয়েকটি উপকূলীয় জেলার কায়েকটি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি করে। ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এবং ২০২০ সালের মে মাসে স্মরণকালের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান তাণ্ডবে বাংলাদেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর এর ১৪টি জেলায় এলজিইডির বিদ্যমান পল্লি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে বিধ্বস্ত অনেক পল্লি সড়ক টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। সেটার জন্যই এই প্রকল্প। ৫৫ জেলার ৩৫৫ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২২ সালের অক্টোবরে এই প্রকল্প শুরু করা হয়। যার ৫ হাজার ৯০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে দুই দফায় দ্বিগুণ সময় বাড়িয়ে মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে অর্থাৎ সোয়া ৬ বছরে বাস্তবায়ন করার কথা।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, কাজ
প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক (৩৩%) এবং ব্রিজ-কালভার্ট (২৮%) পুনর্বাসনের মাধ্যমে পল্লী সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা। টেকসই সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পল্লী পরিবহন ব্যয় ও সময় সাশ্রয় করা, বিভিন্ন পণ্যাদির বাজারজাত ব্যবস্থার সহজীকরণ সাধন। সড়ক অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে কৃষি/অকৃষি খাতে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা।
মেয়াদ বাড়ল ৯২ শতাংশ, কাজ শুরু হয়নি : ২২ শতাংশের
মাঠ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি একবার সংশোধন করা হলেও মোট ব্যয় সামান্য কমেছে। তবে ব্যয় না বাড়লেও প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল বা মেয়াদ প্রায় ৯২.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৮.৯২ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৬২.১৮ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রকল্পের আওতায় থাকা দুই হাজার ১৭৩টি স্কিমের মধ্যে মাত্র ৯৪৮টি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ৭৩৭টি স্কিম বাস্তবায়নাধীন থাকলেও ৪৮৮টি বা প্রায় ২২ শতাংশ স্কিমের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
সড়কের অগ্রগতি হতাশাজনক
প্রতিবেদন অনুযায়ী উপজেলা সড়ক পুনর্বাসনে অগ্রগতি ৬৪.১৯ শতাংশ হলেও ইউনিয়ন সড়কে তা মাত্র ৪৯.৪৫ শতাংশ। আরসিসি সড়কের অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। ব্রিজ পুনর্বাসনে অগ্রগতি তুলনামূলক ভালো হলেও কালভার্ট পুনর্নির্মাণে অগ্রগতি মাত্র ৩০.৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব অবকাঠামো গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রেই কাজের গতি সবচেয়ে ধীর।
সমীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার কাজ শুরু
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত বড় বিনিয়োগের আগে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই করা হয়নি। বিধান অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের বিনিয়োগ প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ প্রকল্পে তা অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের যুক্তি, আম্ফানের পর জরুরি পরিস্থিতির কারণে দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অনুপস্থিতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব ও পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের মতে, প্রকল্পটি ঘূর্ণিঝড় আম্ফান-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো দ্রুত পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয় বিধায় ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
১৪টি অডিট আপত্তি, ৩০.১২ কোটি টাকার অনিষ্পন্ন হিসাব
আইএমইডির তথ্য বলছে, প্রকল্পে এখনো ১৪টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি। পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার ১২.২৩ লাখ টাকার অনিষ্পন্ন অডিট বিষয়ও রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভাও নির্ধারিত হারে অনুষ্ঠিত হয়নি, যা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিম্নমানের নির্মাণের অভিযোগ, রাস্তায় গর্ত
সরেজমিন পরিদর্শনে আইএমইডি এমন কিছু নির্মাণকাজ পেয়েছে। যেখানে রাস্তার কার্পেটিং স্তর পাতলা, নিম্নমানের ইটের খোয়া ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। যথাযথ কম্প্যাকশন না থাকায় অল্প সময়েই রাস্তার ওপরের অংশ উঠে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বিটুমিন উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন পুনর্নির্মিত সড়কও দ্রুত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। যদিও এলজিইডির প্রকৌশলীরা দাবি করেছেন, ডিজাইনের তুলনায় অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণেই এসব ক্ষতি হয়েছে।



