সংসদ প্রতিবেদক
দেশের বাজেট বাস্তবায়ন ও সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো দুর্নীতি, জবাবদিহিতার অভাব এবং সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্কট। গতকাল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি দেশের বর্তমান ‘জুলাই-জুন’ অর্থবছরের পরিবর্তে ‘জানুয়ারি-ডিসেম্বর’ ভিত্তিক অর্থবছর প্রবর্তনের প্রস্তাব দেন। তার মতে, ক্যালেন্ডার ইয়ার বা পঞ্জিকাবর্ষের সাথে অর্থবছরের সমন্বয়সাধন করা হলে বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর হবে। এর ফলে বছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়, তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
গতকাল জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমাদের সমাজে বাজেট বাস্তবায়ন বা টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে দুর্নীতি, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং সততা ও স্বচ্ছতার চরম সংকট। তিনি উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আগাম দুর্যোগের পূর্বাভাস আমলে নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা করা হলে অপচয় ও লুণ্ঠন অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি বাজেট আলোচনায় অংশ নেয়া সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশ, সমাজ, জাতি ও দ্বীনের কল্যাণেই সবাই নিজ নিজ প্রজ্ঞা থেকে কথা বলেছেন। তবে সবার চিন্তা যে এক হবে না-তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সবার চিন্তা একই হলে এত দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হতো না।
সংসদের ভারসাম্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি একটি কার্যকর উপমা ব্যবহার করেন, কোনো যানবাহন যেমন এক চাকায় চলতে পারে না, গাড়ি সচল রাখতে ন্যূনতম দু’টি টায়ার লাগে। এই সংসদেরও দু’টি টায়ার একটি সরকারি দল, আরেকটি বিরোধী দল। যেকোনো একটি টায়ার যদি অকেজো বা বিকল হয়ে যায়, তবে পুরো সংসদীয় ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়বে। এই টায়ারে যদি আপনারা পিন বা পেরেক মারেন, তবে তা ফুটো হয়ে যাবে। আর একটি টায়ার ধ্বংস হলে অবশিষ্টাংশ দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানো যাবে না।
তিনি সংসদে বিরোধী পক্ষকে কথার তীরে ‘কুচি কুচি করে কাটার’ পর আবার ‘ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ চালানোর’ আহ্বান জানানোর প্রবণতাকে একটি দ্বিমুখী নীতি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এই নেতিবাচক রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় তিনি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্বদানকারী জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী এবং স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আব্দুর রবকে।
বিগত সাড়ে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমরা একটি চরম বৈরী ও কষ্টে ভোগা দল। আমাদের বুক থেকে এক এক করে ১১ জন শীর্ষ নেতাকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। সেই সারির ১২ নম্বর জন আজ এখানে জীবিত অবস্থায় আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে; বাকি সবাই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।
তিনি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পল্টন হত্যাকাণ্ড, পিলখানা সেনা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং সর্বশেষে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদ ও আহতদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, চার মাস পার হলেও এই সমস্ত হত্যাকাণ্ডের বিচারিক গতি আশানুরূপ নয়। তিনি অবিলম্বে দৃশ্যমান অগ্রগতির দাবি জানান।
বাজেট সংস্কার : ‘জুলাই-জুন’ অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব
বাজেটের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের চেয়ে এর বাস্তব রূপায়ণের ওপর জোর দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা দেশের প্রচলিত অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনের একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব পেশ করেন। বর্তমানে প্রচলিত ‘জুলাই-জুন’ অর্থবছরের কারণে বছরের শেষ দিকে (মে-জুন) বর্ষা ও বন্যা শুরু হয়। ফলে প্রথম ১০ মাসে বাজেটের মাত্র ৪২% অর্থ খরচ হলেও, শেষ দুই মাসে তাড়াহুড়ো করে বাকি অর্থ ছাড় করা হয়। তিনি বলেন, এর ফলে কাজের মান অত্যন্ত খারাপ হয় এবং অপচয় ও লুণ্ঠন তথা দুর্নীতির দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায়। এর বিকল্প হিসেবে তিনি ফিসকাল ইয়ার বা অর্থবছরকে সরাসরি ক্যালেন্ডার ইয়ার অর্থাৎ ‘জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর’ মেয়াদে পুনর্নির্ধারণ করার সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর বাজেটের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংসদে পেশ ও আলোচনার দাবি জানান।
২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার ও বাজেট ঘাটতি
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন যে, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ লুণ্ঠিত অর্থ কিভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, এই বাজেটে তার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা আইনি প্রস্তাবনা নেই।
তিনি হিসাব দিয়ে বলেন, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র ৯ ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যায়, তবে বাংলাদেশের কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। তিনি সরকারকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে দ্রুত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সম্পদ এবং সেই সাথে পাচারকারী কালপ্রিটদের দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করার আহ্বান জানান।
শিক্ষা খাতের সঙ্কট ও বহুমাত্রিক সংস্কারের দাবি
শিক্ষা খাতকে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও ভিশনহীন খাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে এতগুলো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে আমরা দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছি। মেধার মূল্যায়নের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়াই এর মূল কারণ। শিক্ষা খাতের বৈষম্য দূরীকরণে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেন।
কওমি ও ইবতেদায়ী মাদরাসা : দেশের বিশাল একটি অংশ কওমি ও ইবতেদায়ী মাদরাসার সাথে যুক্ত, যারা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিচ্ছে। অথচ বাজেটে তাদের কোনো বরাদ্দ বা কনসিডারেশন নেই। তাদের শীর্ষ সংস্থা ‘হাইয়্যাতুল উলয়া’র সাথে বসে স্বকীয়তা বজায় রেখে তাদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেয়া উচিত।
এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণ : রাজনৈতিক লাইকিং-ডিসলাইকিং বা আঞ্চলিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে ওঠে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে যোগ্য নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়করণের (জাতীয়করণ) প্রস্তাব দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি দেয়ার কারখানা না বানিয়ে গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করার আহ্বান জানান। প্রয়োজনে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে দেশের শীর্ষ পাঁচ-সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য বা প্রজেক্ট অ্যাসাইন করার প্রস্তাব দেন।
স্বাস্থ্য খাতের করুণ দশা ও ‘আদ-দ্বীন হাসপাতাল’ প্রসঙ্গ
স্বাস্থ্য খাতের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে হাসপাতালে গিয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকছে। তিনি নতুন কোনো বড় অবকাঠামো গড়ার আগে বিদ্যমান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর জরাজীর্ণ দশা মেরামত, শয্যাসঙ্কট দূরীকরণ এবং লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
সম্প্রতি বিতর্কে জড়ানো আদ-দ্বীন হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি একে একটি মানবিক সঙ্কট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রায় ৭৫০ জন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী এবং সমসংখ্যক নার্সিং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও প্র্যাকটিক্যাল ক্যারিয়ার জড়িত। তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীর বিচার হোক, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সময় বেঁধে দিয়ে দ্রুত সংস্কার সাপেক্ষে চালু না করলে শিক্ষার্থীরা মাঝপথে ‘ব্ল্যাকআউট’ হয়ে যাবে এবং বিদেশী শিক্ষার্থীরা আর বাংলাদেশে পড়তে আসবে না।
প্রবাসীদের জন্য টাস্কফোর্স ও মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট ভাঙার আহ্বান
রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের এই বাজেটে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। প্রবাসীদের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স বা সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে চলা সিন্ডিকেটের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, যেখানে মাত্র ৮৫ হাজার টাকায় একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা, সেখানে সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ছয়-সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। তিনি এই গণতান্ত্রিক সরকারকে কঠোর হস্তে এই চেইন ও সিন্ডিকেট ভেঙে খানখান করে দেয়ার আহ্বান জানান।
আঞ্চলিক উন্নয়ন ও স্থানীয় সমস্যা
বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি দেশের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি জনদুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন :
ঢাকা-১৫ আসন (মিরপুর-কাফরুল) : তার নিজ নির্বাচনী এলাকার তীব্র পানি সঙ্কটকে ‘কারবালার’ সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, মানুষ এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার করছে, অথচ রাজনৈতিক যোগসাজশে রাতের বেলা পাইপ কেটে অবৈধ সংযোগের ব্যবসা চলছে। তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক : ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয় লেনের কাজের ধীরগতির সমালোচনা করে তিনি একে ‘আগ্রার তাজমহল’-এর সাথে তুলনা করেন। কচ্ছপের গতিতে চলা এই কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেন।
জলাবদ্ধতা ও ভোলা সেতু : খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকার দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসনে অগ্রাধিকার দেয়ার অনুরোধ জানান। একই সাথে, ভোলা জেলাকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করতে ‘ভোলা-বরিশাল সেতু’ নির্মাণের বিষয়টি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।



