নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্র ও ব্যাংক লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপ এবং তার সহযোগীদের ব্যাংকিং খাতে পুনর্বাসনের চেষ্টার প্রতিবাদে রোববার একযোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে গাজীপুর, যশোর, ফেনী ও বগুড়ায়। ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে হাজার হাজার গ্রাহক, ব্যবসায়ী, আমানতকারী, প্রবাসী পরিবারের সদস্য, আলেম-ওলামা ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এমডিকে ঘিরে উত্তেজনা
দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে আবার বড় ধরনের প্রশাসনিক ও পরিচালন সঙ্কট দেখা দিয়েছে। চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁনকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তায় ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। একই সাথে গ্রাহকদের আন্দোলন ও পরিচালনা পর্ষদের সভা বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
গতকাল রোববার দুপুরে ব্যাংকটির এমডি মো: ওমর ফারুক খাঁন চেয়ারম্যান বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। পরে বিকেলে চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমানও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা রোববার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ওই সভায় এমডির পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে গ্রাহক আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সভাটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।
ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে সকাল থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে গ্রাহক ও কিছু কর্মকর্তা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। তারা ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। আন্দোলনকারীরা চার দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল-এমডিকে অপসারণ করা হলে চেয়ারম্যানকেও অপসারণ করতে হবে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, এস আলম গ্রুপকে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং গ্রাহকদের আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমান ও এমডি ওমর ফারুক খাঁনকে ছুটিতে পাঠানো হয়। গত ১২ এপ্রিল পরিচালনা পর্ষদের সভায় তাদের ছুটি অনুমোদন করা হয়েছিল। চেয়ারম্যান বিদেশে অবস্থান করলেও অনলাইনে সভায় অংশ নেয়ার শর্ত ছিল।
অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান গত বছরের জুলাইয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক, ইউনিভার্সিটি অব বোকোনি ও ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনে ভিজিটিং অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গাজীপুরে মানববন্ধন
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় শ্রীপুরের শিল্পাঞ্চল মাওনা চৌরাস্তায় ইসলামী ব্যাংক মাওনা শাখার সামনে এই কর্মসূচি পালিত হয়। সভাপতিত্ব করেন পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. হারুনুর রশিদ। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন ভবানীপুর মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক এমদাদুল হক, শিক্ষক আজিজুল হক মাস্টার, মোস্তাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ মাসুম, কবির হোসেন মোল্লা ও মনিরুজ্জামান সজীবসহ স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষ।
যশোরে বিশাল সমাবেশ
যশোর অফিস জানায়, গতকাল বেলা ১১টার পর শহরের আর এন রোডে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখার সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে হাজার হাজার গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। সমাবেশ থেকে ব্যাংক পুনরুদ্ধারে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়।
ফেনীতে পৃথক দুই স্থানে মানববন্ধন
ফেনী অফিস জানায়, একই দিন দুপুরে শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে জেলা শাখা এবং কলেজ রোডে কলেজ শাখার সামনে পৃথকভাবে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মোট তিন শতাধিক গ্রাহক এতে অংশ নেন। জেলা শাখার সামনে বক্তব্য রাখেন মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, নাসির উদ্দিন, মো: সেলিম, আব্দুর রাজ্জাক ও ইসমাঈল হোসেন।
বগুড়ায় সাতমাথায় কর্মসূচি
বগুড়া অফিস জানায়, রোববার সকালে সাতমাথায় মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহীন মিয়া। ফোরামের সদস্যসচিব আজগর আলীর পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি পদপ্রার্থী ও গ্রাহক ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজা, আইনজীবী আল আমীন, ড. মাওলানা হেদাইতুল ইসলাম, অধ্যক্ষ ইকবাল হোসেন, আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল হান্নান, সাবেক কাউন্সিলর এরশাদুল বারী এরশাদ, সাংবাদিক হাবিবুর রহমান আকন্দ এবং মহিলা আমানতকারী শাহনেওয়াজ রেবা ও নার্গিজ আরাসহ আরও অনেকে।
চার জেলার মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। কোটি গ্রাহক, আমানতকারী, উদ্যোক্তা ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ভরসাস্থল এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ।
বগুড়ার বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংক দখল করে প্রকৃত মালিকদের বের করে দিয়ে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা লোপাট করে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত পঙ্গু করে দেয়। তারা আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানেও ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা চলছে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জোর করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
ফেনীর বক্তারা বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর ব্যাংকে একবার স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল। কিন্তু এখন আবার এস আলমকে ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র চলছে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং তা প্রতিহত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
যশোরের বক্তারা বলেন, দেশের প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের আমানত ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে। দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহিতা ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তারা।
বিভিন্ন স্থানের মানববন্ধন থেকে একাধিক দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - বিগত এক দশকের বড় ঋণ, মালিকানা পরিবর্তন ও আর্থিক লেনদেনে আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক অডিট; এস আলমসহ ব্যাংক লুটকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা; পাচার ও আত্মসাৎকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার; অবৈধভাবে নিযুক্তদের প্রবেশ ঠেকানো; প্রকৃত মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা; গ্রাহকদের আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; বিতর্কিত আইনগত সুবিধা বাতিল এবং ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন শরিয়াহভিত্তিক আদর্শ ও নৈতিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
সিলেট ব্যুরো জানায়, ইসলামী ব্যাংকিং খাত ধ্বংস, গভর্নরের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এমডি ওমর ফারুক খানকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে সিলেটে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রোববার বেলা ২টায় ইসলামী ব্যাংকিং গ্রাহক ঐক্য পরিষদ সিলেটের উদ্যোগে নগরীর তালতলাস্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে উক্ত মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক ফাতির আহমদের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব কবির আহমদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকের বিপুল সংখ্যক গ্রাহক অংশ নেন।
মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শহীদ আহমদ চৌধুরী সাজু, সাবেক ব্যাংকার বদরুল আমীন হারুন, সিলেট জেলা বারের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামিল আহমদ রাজু, অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন শামীম, এলিগেন্ট শপিং সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির, ওয়েস্টার গ্রুপের ইমরান হোসেন, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন, ব্যাংক গ্রাহক শরীফ উদ্দিন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খলিল আহমদ, ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান, গোলাম কিবরিয়া ও ব্যাংক গ্রাহক তানজির হোসেন প্রমুখ।



