সোয়া কোটি টাকায় নির্মিত সড়ক দুই মাসেই ধস

Printed Edition
ধসে পড়া সড়কের বিভিন্ন অংশ : নয়া দিগন্ত
ধসে পড়া সড়কের বিভিন্ন অংশ : নয়া দিগন্ত

এম মনিরুজ্জামান রাজবাড়ী

নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় ধসে পড়তে শুরু করেছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড) সড়ক। প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের অন্তত ১৫ থেকে ২০টি স্থানে ধস দেখা দেয়ায় নির্মাণকাজের মান, তদারকি এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

সড়কটি দৌলতদিয়া আক্কাস আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্প হয়ে রিকাতের দোকান পর্যন্ত বিস্তৃত। চলতি বছরের ১০ জুন নির্মাণকাজ শেষ হয়। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে এমন প্রত্যাশা থাকলেও দুই মাস না পেরোতেই সড়কের বিভিন্ন অংশে ধস দেখা দেয়ায় এখন ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ মাটির রাস্তা টেকসইকরণের লক্ষ্যে এইচবিবিকরণ প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল এক কোটি ২৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭২৫ টাকা। তবে কার্যাদেশের মূল্য ছিল এক কোটি ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৮ টাকা। উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাকী এন্টারপ্রাইজ গত ১২ মার্চ কাজ শুরু করে ১০ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ করে।

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ধস সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও গাইডওয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও নিচের অংশ দেবে গেছে। কয়েকটি স্থানে ইট উঠে গিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও ধসে যাওয়া অংশে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। গাইডওয়ালের নিচে ২৫০ মিলিমিটার পুরু ইটের গাঁথুনি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয়নি। পাশাপাশি পুরনো ও ছিদ্রযুক্ত বিটুমিন ড্রাম শিট জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। রাস্তার দুই পাশের ঢালে প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট, কম্প্যাকশন ও ঘাসের টার্ফিং যথাযথভাবে না করায় অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্মাণকাজ চলাকালেই তারা কাজের মান নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। এমনকি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়েছিলেন। তবে পরে সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি।

স্থানীয় কৃষক আলতাফ শেখ বলেন, রাস্তাটি নির্মাণ হওয়ায় আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে কাজ হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। নিম্নমানের কাজের কারণেই অল্প বৃষ্টিতে রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। মমিন ফকির বলেন, কাজ শুরুর সময়ই ভালোভাবে কাজ করার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার আমাদের কথায় গুরুত্ব দেননি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ফাতেমা বেগমের ভাষ্য, মানুষের সুবিধার জন্য সরকার কোটি টাকা ব্যয় করছে। কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। সামনে তো আরো বৃষ্টি হবে। তখন কী হবে? স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল মোল্লা বলেন, সঠিক তদারকির অভাবেই সরকারের কোটি টাকার প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়ছে। অভিযোগ করার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

তবে নিম্নমানের নির্মাণকাজের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি মো: হাবিবুর রহমান। তার দাবি, সরকারি নকশা ও নির্দেশনা মেনেই কাজ করা হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে কোথাও ক্ষতি হয়ে থাকলে দ্রুত তা মেরামত করে দেয়া হবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: আবু বকর বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিকাদারকে কাজের মান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। বর্তমানে টানা বৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে ধস দেখা দিয়েছে। ঠিকাদারকে দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকায় জামানত ফেরতের আগে প্রয়োজনীয় সব মেরামত ঠিকাদারকে নিশ্চিত করতে হবে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, নির্মাণকাজ চলাকালে পাওয়া অভিযোগ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছিল। এখন ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি সরেজমিন পরিদর্শন করে কাজের মান যাচাই করা হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত সড়কটি মেরামত করা হবে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। পুরো প্রকল্পের নির্মাণমান ও নকশা অনুসরণের বিষয়টি স্বাধীন কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।