মো: আবদুস সালিম
নলের মতো লম্বা গলা, লম্বা পা, সুচালো ও লম্বা ঠোঁট। বলছি, বেগুনি বকের কথা। এ পাখি মানুষ কিংবা আক্রমণ বা ক্ষতি করতে পারে, এমন কিছু দেখলে পুরো শরীর আকাশমুখী করে ফেলে। তারপর উড়াল দেয়। অবশ্য খাবারের খোঁজে কিংবা বিশ্রামের সময়ে আকাশমুখী না থেকে স্বাভাবিকই থাকে। অনেক সময়ে বিপদ দেখলে বন কিংবা ঝোপঝাড়ের ভেতর ঢুকে পড়ে। এদের শরীরের রঙ এমনই, যা গাছপালার রঙের সাথে মিশেও যায়। এটাই ওদের লুকিয়ে যাওয়ার বড় কৌশল। বেগুনি বকের ঘাড়ের উপরের কিছু অংশ, পিঠ ও এর উপরের অংশের রঙ ছাই-ধূসর। তার মধ্যে দেখা যায় কিছু বেগুনি আভা। হালকা লাল পিঠের নিচের অংশ। উড়াল দিলে দুই ডানার শেষাংশে দেখা যায় কিছু কালো পালক। ঘাড়ের একপাশে ও চিবুক লাল। দুটো কালো সরু রেখা গলার দুই পাশে। তা নিচে নেমে মিশে গেছে বুকের দিকে। কিছু কালো পালক (সুতার মতো দেখতে) কানের কাছ থেকে চলে গেছে পেছনের দিকে। মাথার নিচে গলার কিছু অংশ সাদা। পা ও ঠোঁট হলদে। অল্প কিছু পালক বুক ও ঘাড়ের দু’পাশে ঝুলে রয়েছে, যা এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৫ সেন্টিমিটার। ওজন দেড়-দুই কেজি হবে। ওরা দেখতে কিছুটা ধূসর বকের মতো। তবে সেই তুলনায় আকারে কিছুটা ছোট। দেখতে প্রায় একইরকম স্ত্রী-পুরুষেরা। তবে রঙের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের সাথে। ছানাদের শরীরের রঙ কিছুটা লালচে-বাদামি।
বেগুনি বকের ইংরেজি নাম পার্পেল হিরন (চঁৎঢ়ষব যবৎড়হ)। সায়েন্টিফিক নাম অৎফবধ চবৎঢ়ঁৎবধ (আরডিয়া পুরপুরিয়া)। আরডিয়া বলতে বুঝায় বক-জাতীয় কোনো পাখিকে। আর পুরপুরিয়া মানে বেগুনি রঙের কোনো কিছু। এ পাখিকে অনেকে ঝুঁটিকাক, খয়রা কানা ইত্যাদি নামেও ডাকে। এরা আমাদের আবাসিক পাখি হলেও প্রায় ৫০ বছর ধরে খুব একটা নজরে আসছে না। তাতে বুঝা যায় এদের সংখ্যা বা পরিমাণ কমছে। তবে সামান্য কিছু বেগুনি বক এ দেশের হাওর-নদী-বিলের ধারে দেখা যায় শীতের সময়ে। এ কারণে এ পাখিকে অনেকে পরিযায়ী বা পরবাসী বা অতিথি পাখি বলে থাকেন।
এ পাখির প্রজননের সময় জানুয়ারি-মে মাস। এ সময়ে গাছের উপর বড়সড় বাসা বাঁধতে ঘাস, লতাপাতা ইত্যাদি জড়ো করে। হালকা নীল বা সবুজাভ ডিম দেয় ৪-৫টি করে। তাতে তা দেয় বাবা-মা মিলেমিশে। ডিম থেকে ছানা বের হয় ২৬-২৭ দিনে। দুই মাস বয়স হলে উড়তে শিখে ছানারা। এ পাখির দেখা মেলে আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে। ধারণা করা হচ্ছে, পৃথিবীতে বর্তমানে এ পাখির সংখ্যা প্রায় চার লাখ হবে। ‘প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন’ জানিয়েছে, ধীরে হলেও কমছে এ পাখির সংখ্যা বা প্রজনন। তারা আরো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অল্প পর্যায়ের ঝুঁকিতে আছে বেগুনি বকেরা।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রবন্ধকার



