নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সাংগঠনিক অপরাধের বিচার দলটির নিজস্ব শাসনামলে প্রণীত আইনেই করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। তিনি উল্লেখ করেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার এবং ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার নীতি অনুযায়ী দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচারের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো দেশে বিদ্যমান রয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এসব কথা বলেন।
গত ৪ জুলাই এক স্মরণসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যের সূত্র ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩’ প্রণয়ন করেছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারই এই আইনে সংশোধন এনে অপরাধী ‘অর্গানাইজেশন’ বা সংগঠনকে বিচারের আওতায় আনার বিধান যুক্ত করে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারই ২০০৯ সালে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ প্রণয়ন করে, যার বিধান অনুযায়ী কেবল ব্যক্তি নয়, কোনো অপরাধী ‘সত্তা’ বা সংগঠনকেও বিচারের মুখোমুখি করার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালের ১ আগস্ট এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮-এর ১৮ ধারা ব্যবহার করেই তৎকালীন সরকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। অতএব, দল নিষিদ্ধের প্রক্রিয়াসহ সব ধরনের কঠোর আইনি সংস্কার আওয়ামী লীগই করে রেখেছিল এবং বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর অপরাধের তদন্ত করছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে অপরাধের সত্যতা মিললে এই আইনেই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার সুনিশ্চিত করা হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও আইনি অধিকার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেন যে, ক্ষমতাচ্যুত ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা বা বাধা নেই, তবে তার আপিল করার আইনি সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র দায় নিয়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে; এটি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে হয়নি। আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল বিভাগে আপিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট সময়সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় সাধারণ আইনি নিয়মে এখন আর তার আপিল করার সুযোগ নেই। তবে প্রসিকিউশন চায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরে নিজের বিরুদ্ধে হওয়া দণ্ড এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর আইনি মোকাবেলা করুন এবং সময় পার হওয়ার পর আপিল দায়েরের আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এখতিয়ার। এ ছাড়া শাপলা চত্বরের গণহত্যা মামলাসহ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরো বহু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা তদন্তাধীন ও প্রতিবেদন দাখিলের অপেক্ষায় রয়েছে এবং এরই মধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় বাংলাদেশে এসে তার এই বিচার মোকাবেলা করা উচিত।
প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে আসামি করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ঘটনার শুরু থেকেই হাসানুল হক ইনুর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এবং তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে তার নির্দেশনাতেই ৫ মের পর দু’টি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছিল ও গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়, যার দায় তিনি পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজেই স্বীকার করেছিলেন। এটি একটি বিশাল ঘটনা হওয়ায় তথ্য-প্রমাণ গুছিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগলেও ইনু এই মামলায় নিশ্চিতভাবেই আসামি হচ্ছেন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের একাধিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে যাদের ইতোমধ্যেই বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে, তারা স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থানার একটি মামলার নথিতে দেখা গেছে, পুলিশ কাগজে-কলমে নিজেদের কর্মকর্তাদের নামে অস্ত্র বণ্টন দেখাতো, কিন্তু বাস্তবে সেই মারণাস্ত্রগুলো তুলে দেয়া হতো আওয়ামী লীগের ক্যাডার বা সন্ত্রাসীদের হাতে, যারা পুলিশের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে ছাত্র-জনতার ওপর সেসব অস্ত্র ব্যবহার করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।



