জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

অর্থপাচারে জড়িত এস আলম, বসুন্ধরা শেখ হাসিনাসহ ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

  • রাষ্ট্র মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা
  • মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা

অর্থপাচারে জড়িত ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করেছে সরকার। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলো- সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, ডা: এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপ।

গতকাল রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের (মহিলা আসন-৩৯) সংসদ সদস্য জামায়াতের মহিলা বিভাগের নেত্রী অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহারের উত্থাপিত তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা জানান।

সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২০০৯-২০২৩ সময়কালে বাংলাদেশ হতে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার এ পর্যন্ত মোট কত অর্থ ও সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে কি না; করলে, তার বাস্তব অগ্রগতি কতদূর?

জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করে বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে এবং এ বিষয়ে দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। এ ছাড়া, সংশ্লিষ্ট দু’টি দেশের ব্যক্তি বা সত্তার মধ্যে সম্পাদিত ইনফরমাল লেনদেনের তথ্যপ্রাপ্তির কোনো ব্যবস্থা না থাকার কারণে এক দেশ হতে অন্য দেশে ইনফরমাল চ্যানেলে পাচারকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা যায় না। তবে এটা সত্য বিগত সরকারের আমলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক এখন পর্যন্ত দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত করা হয়েছে। পাচারকৃত এ অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে :

(ক) বাংলাদেশ হতে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেস চিহ্নিত করা হয়। কেইসগুলো হলো : সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপ।

(খ) উক্ত মামলাগুলো অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (Joint Investigation Team- JIT) গঠন করা হয়। JIT গঠনের পর ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ সংযুক্ত (Attachment) ও অবরুদ্ধ (Freezing) করা হয়েছে; (গ) দেশের আদালত কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে ২৩টি Mutual Legal Assistance Request (MLAR) প্রেরণ করা হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪২টি মামলা রুজু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি মামলার চার্জশীট দাখিল করা হয়েছে এবং ০৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।

(ঘ) অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি (Canada, USA, UK, UAE, Singapore, Malaysia, Australia, Switzerland, Thailand and Hongkong- China) দেশের সাথে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (MLAT) স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দু’টি দেশের (মালয়েশিয়া এবং হংকং-চায়না) সাথে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে; (ঙ) বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স এবং যৌথ তদন্ত দলের সমন্বয় কার্যক্রম আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে বিএফআইইউর অধীনে Stolen Asset Recovery Division গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দক্ষ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের অনুসরণে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে; (চ) বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হচ্ছে। (ছ) ফৌজদারি (ক্রিমিনাল) মামলার পাশাপাশি সিভিল প্রোসিডিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি কেস থেকে ৬টি কেস নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচিত ঋণগ্রহীতা গ্রুপের বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং ১২টি আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। (জ) দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক রেজুলিউশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে।

রাষ্ট্র মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা : জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে। গত ৩০ জুনের হিসাবে এ তথ্য জানিয়েছেন মন্ত্রী।

গতকাল জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: আব্দুল আলীমের প্রশ্নোত্তরে তিনি এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এ সময় সভাপতিত্ব করেন। প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। সংসদ সদস্য মো: আব্দুল আলীম প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত এবং ব্যাংকভিত্তিক হিসাব কী?

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬টি ব্যাংক (অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি) এর ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

তিনি জানান, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯০২৯ .৬৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮৮.৭৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮১৩১.০৯ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫৩৯৬.৬৭ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯২৮১.৭৪ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫০৪৮.৩৯ কোটি টাকা।

আমরা একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছি- অর্থমন্ত্রী : বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে নেয়া অপরিকল্পিত ঋণ ও ১৩০০ প্রকল্পের বিশাল দায়ভার বর্তমানে সরকারকে বইতে হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন চলছে এবং এর ভিত্তিতে অনেক প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে।

গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে নেয়া ঋণের বিশাল দায় আজকে বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। ওই অল্প সময়ে নেয়া এত ঋণ দেশের অর্থনীতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছে, তার রিপেমেন্ট (পরিশোধ) করতে গিয়ে বর্তমান সরকারকে অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করতে হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংকিং সেক্টর ও শেয়ার বাজারে যে লুটপাট হয়েছে তার দায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব-সব মিলিয়ে আমরা একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছি। তবে আমরা আশাবাদী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকার যখনই এমন সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে, দেশকে উদ্ধার করেছে। আজকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে ভিশন রয়েছে, তা নিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ এগিয়ে যাচ্ছি।

দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা : বর্তমানে দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকার বেশি বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান।

অধিবেশনে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের (৭৫ কুষ্টিয়া-১) লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ দশমিক ১৯ টাকা। অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো সুশৃঙ্খল করার ওপর জোর দিচ্ছে।