- ক্যাম্পে বাড়ছে মানবিক ও নিরাপত্তাসঙ্কট
- ছয় মাসে স্থলমাইন বিস্ফোরণে নিহত ৬
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে সঙ্ঘাত আবারো তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা বেড়েছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আরাকান আর্মির সদস্যরা সীমান্ত লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ড্রোন উড়িয়ে নজরদারি চালাচ্ছে। একই সাথে সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থলমাইন পেতে রাখার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব মাইনের বিস্ফোরণে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন বাংলাদেশী কৃষক ও গ্রামবাসী হতাহত হয়েছেন। এ দিকে টানা বর্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ভূমিধস ও প্রাণহানির ঘটনা মানবিক সঙ্কটকে আরো গভীর করেছে।
গত ১ জুলাই রাত থেকে মংডু ও বুথিডং এলাকায় মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ এবং ভারী অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দে টেকনাফ পৌরসভা, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত এলাকা প্রকম্পিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘ কয়েক মাস পর সীমান্তের ওপারে এত তীব্র সংঘর্ষের শব্দ শোনা গেছে। বিমান হামলার অভিঘাতে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়িও কেঁপে ওঠে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত দেড় বছরে মিয়ানমার থেকে এক লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে অনুপ্রবেশ করেছে। এর আগে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৯৪ হাজার ১২৩ জন । চার হাজার একর জমিতে বর্তমানে নারী ও শিশু বসবাস করছে ৭৮ শতাংশ। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভূমিধসে মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত এবং পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মির পেতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে ছয়জন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৮০ জনকে আটক করেছে।
সীমান্তে সতর্কতা, তবু উদ্বেগ
পরিস্থিতি মোকাবেলায় নাফ নদসহ পুরো সীমান্তজুড়ে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে না উঠলেও সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন বলেন, চলমান সঙ্ঘাতের কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। তাই সীমান্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।
১৬ মাসে দেড় লাখ নতুন অনুপ্রবেশ : জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৬ মাসে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে নিবন্ধিত হয়েছেন। গত কয়েক মাসে প্রায় তিন হাজার নতুন করে যুক্ত হয়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
রোহিঙ্গাদের জন্য যৌথ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় প্রায় ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থের এক-চতুর্থাংশেরও কম পাওয়া গেছে। মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, অর্থসঙ্কট অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। পাশাপাশি প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার শিশুর শিক্ষাকার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভূমিধসে প্রাণহানি, ঝুঁকিতে হাজারো পরিবার
চলতি বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ভূমিধসের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত ৫ জুলাই উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে টিলাধসে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে ১৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভূমিধস ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলো বর্ষার অতিবৃষ্টি ও ভূমিক্ষয় মোকাবেলায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সঙ্কটের কারণে কক্সবাজারে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পাহাড়ের স্থিতিশীলতা কমিয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি আরো বাড়িয়েছে।
প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, বাড়ছে চাপ
সরকারি সূত্র বলছে, ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের ফলে খুনসহ কিছু অপরাধ কমলেও মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন অনুপ্রবেশের ঢেউ শুরু হলে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ও সামাজিক উত্তেজনা আরো বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি এখনো মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। সীমিত আকারে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের উদ্যোগ থাকলেও তা সামগ্রিক সঙ্কটের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা, নতুন অনুপ্রবেশ এবং মানবিক সঙ্কট, সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরো বাড়তে থাকবে।



