নির্যাতনের রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ করছে ইসরাইল : জাতিসঙ্ঘ কমিটি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ইসরাইলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত
  • পশ্চিমতীরে ইসরাইলি অভিযানে শত শত ফিলিস্তিনি আহত
  • রাফার সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের কাছে খাবার-পানি নেই
  • তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে গাজার শিশুরা : ইউনিসেফ

জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি জানিয়েছে, ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংগঠিত ও ব্যাপক নির্যাতনের ‘কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতি’ অনুসরণ করছে, এমন প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। আটক অবস্থায় খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা, মারধর, ইলেকট্রিক শক ও যৌন নির্যাতনের মতো অভিযোগও তাদের রিপোর্টে উঠে এসেছে। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষর করা দেশগুলোর রেকর্ড নিয়মিত পর্যালোচনা করে জাতিসঙ্ঘের এই কমিটি। দেশগুলোর পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থার কাছ থেকেও সাক্ষ্য নেয় তারা। খবর বিবিসির।

ইসরাইলের বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের এই কমিটির সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেশটির এবং ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরাইলি আটকেন্দ্রের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরাইল হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে।

ইসরাইলের প্রশাসনিক আটক আইন এবং আনলফুল কম্ব্যাট্যান্টস আইনের অধীনে এই ব্যক্তিদের অনেককে দীর্ঘ সময় ধরে আইনজীবী বা পরিবারের সাথে যোগাযোগের সুযোগ ছাড়াই আটক রাখা যায়। অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার বলেছে, তাদের প্রিয়জন যে আটক হয়েছেন এ কথা জানতে তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, এটি কার্যত ‘জোরপূর্বক গুম’। জাতিসঙ্ঘের এই কমিটি শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধসহ বহু ফিলিস্তিনিকে আনলফুল কম্ব্যাট্যান্টস আইনের অধীনে গণহারে আটক করার অভিযোগে বিশেষভাবে সমালোচনা করেছে। তবে কমিটির সর্বশেষ রিপোর্টে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে আটক অবস্থার বর্ণনায়। প্রমাণে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের নিয়মিত খাবার ও পানি থেকে বঞ্চিত করা হয়, মারধর করা হয়, কুকুর দিয়ে আক্রমণ করানো হয়, ইলেকট্রিক শক, ওয়াটারবোর্ডিং ও যৌন নির্যাতন করা হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে তাদের স্থায়ীভাবে শেকল পরিয়ে রাখা, টয়লেট ব্যবহার করতে না দেয়া এবং ডায়াপার পরতে বাধ্য করার অভিযোগও আছে।

কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব আচরণ ‘যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল’। তারা আরো বলেছে, সংগঠিত নির্যাতনের এই ‘কার্যত নীতি’ আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার অন্যতম উপাদান। অবশ্য ইসরাইল বারবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিটির সদস্য ডেনমার্কের পিটার ভেডেল কেসিং বলেছেন, তারা যা শুনেছেন তাতে তারা ‘গভীরভাবে বিস্মিত এবং স্তম্ভিত’। কমিটির সদস্যরা অভিযোগগুলোর তদন্ত বা বিচার না হওয়ার কথাও উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেছেন। তারা ইসরাইলকে স্বাধীন তদন্ত শুরু করতে এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাসহ দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরাইল অবশ্য দীর্ঘ দিন ধরে জাতিসঙ্ঘকে পক্ষপাতদুষ্ট সংস্থা বলে অভিযোগ করে আসছে এবং সর্বশেষ রিপোর্টের পর প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে শুনানির সময় দেশটির রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন এসব অভিযোগকে ‘ভ্রান্ত তথ্য’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, ‘ইসরাইল নৈতিক মূল্যবোধ ধরে রেখে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। বিবিসি বলছে, এই রিপোর্ট এমন এক সময় এসেছে যখন ইসরাইলের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতর শুক্রবার বলেছে, পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনাদের

ইসরাইলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত : দক্ষিণ গাজায় যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে খান ইউনুসের পূর্বে বানি সুহেইলা শহরে একটি ড্রোন হামলায় দুই ভাই জুমা ও ফাদি তামের আবু আসি নিহত হয়। আলজাজিরাকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আল-ফারাবি স্কুলের কাছে একদল বেসামরিক মানুষের ওপর ইসরাইলি ড্রোন একটি বোমা নিক্ষেপ করে। গুরুতর আহত অবস্থায় দুই শিশুকে খান ইউনুসের নাসের মেডিক্যাল কমপ্লেক্সে নেয়া হলে সেখানে তাদের মৃত্যু ঘোষণা করা হয়। খবর আলজাজিরার।

হামলাটি ঘটে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরাইলি বাহিনীর পুনরায় অবস্থান নির্ধারণের সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি বাহিনী বারবার হামলা চালিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার ভোরে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে স্থল, নৌ ও আকাশ তিনমুখী হামলা চালায় ইসরাইল। মেডিক্যাল সূত্র জানায়, খান ইউনুসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আল-কারারা শহরে ইসরাইলি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। একই দিন সকালে গাজা শহরের পূর্বাঞ্চলের তুফফাহ পাড়ায়ও বিমান হামলা চালানো হয়। দক্ষিণের রাফাহ শহরের পূর্বাঞ্চলেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে শত শত ফিলিস্তিনি আহত : অধিকৃত পশ্চিমতীরের তুবাস প্রদেশে ইসরাইলি বাহিনীর টানা অভিযানে দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। বুধবার থেকে শুরু হওয়া বৃহৎ সামরিক তৎপরতা ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে অঞ্চলের অবকাঠামো, সড়ক, পানির লাইন ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, তুবাসে আহতদের মধ্যে অন্তত ৭৮ জনকে হাসপাতাল চিকিৎসা নিতে হয়েছে। শুক্রবার তাম্মুন ও ফারাআ শরণার্থীশিবির থেকে ইসরাইলি সৈন্যরা সরে গেলেও এরপর তারা হামলার কেন্দ্রস্থল স্থানান্তর করে তুবাস শহরসহ আশপাশের আয়য়াবা ও তায়াসির গ্রামগুলোতে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, গত চার দিনে প্রায় দুই শতাধিক ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। অধিকাংশকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেয়া হলেও অন্তত আটজনকে সামরিক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তুবাস ছাড়া কালকিলিয়া, জেনিন ও নাবলুসেও পৃথক অভিযানে আরো অন্তত নয়জনকে আটক করা হয়েছে। ওয়াফা সংবাদ সংস্থা জানায়, শনিবার ভোরে কালকিলিয়ায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়, যাদের মধ্যে দুই শিশু ও এক নারীও রয়েছে।

রাফার সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের কাছে খাবার-পানি নেই : ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার রাফাতে সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন হামাসের কয়েক ডজন যোদ্ধা। তাদের সাথে হামাসের অন্য সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এ ছাড়া সুড়ঙ্গে আটকে থাকা এসব যোদ্ধার কাছে খাবার ও পানিও নেই। গত মাসে দখলদার ইসরাইলের সাথে হামাসের যুদ্ধবিরতি হয়। ওই সময় রাফার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে দেয় ইসরাইলি সেনারা।

শুক্রবার সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ফিলিস্তিনের একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, রাফাতে ৬০ থেকে ৮০ যোদ্ধা আটকে আছেন। হামাস সূত্র জানিয়েছে, এসব যোদ্ধার সাথে গত কয়েকমাস ধরেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়া তাদের কাছে খাবার ও পানিও নেই। আটকে পড়া যোদ্ধাদের কয়েকজন বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে দখলদাররা। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। ইসরাইল জানিয়েছে, হামাসের আটকে পড়া যোদ্ধাদের হাতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর তাদের ইসরাইলি কারাগারে নিয়ে আটকে রাখা হবে। কিন্তু হামাস জানিয়েছে, যোদ্ধারা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করবে না। এর আগে গত বুধবার হামাস প্রথমবারের মতো স্বীকার করে তাদের যোদ্ধারা রাফার সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছেন। ওই সময় তাদের নিরাপদ প্রস্থানের দাবি জানায় সশস্ত্র এ গোষ্ঠী। তারা এক বিবৃতিতে বলে, ‘আমাদের যোদ্ধাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য আমরা ইসরাইলকে দায়ী করছি। আমাদের সন্তানরা যেন বাড়িতে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা করতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি।’ মধ্যস্থতাকারীরা হামাসের এসব যোদ্ধাকে নিরাপদ প্রস্থান দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল; কিন্তু যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ইসরাইলি প্রধানমন

তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে গাজার শিশুরা : ইউনিসেফ : গাজায় উচ্চ মাত্রার অপুষ্টি শিশুদের জীবন ও সুস্থতার জন্য বিপন্ন করে তুলছে। গতকাল শনিবার ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, শহরটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৯ হাজার ৩০০ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। জাতিসঙ্ঘের সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘উচ্চ মাত্রার অপুষ্টি শিশুদের জীবন ও সুস্থতার জন্য বিপন্ন করে তুলছে, শীতের আবহাওয়ার সূত্রপাত রোগের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।’ ইউনিসেফ জানিয়েছে, গত মাসে সংস্থাটি এবং তাদের অংশীদারদের পরিচালিত পুষ্টি পরীক্ষায় ‘পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৯ হাজার ৩০০ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে।’ সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, গাজা সীমান্তে প্রচুর পরিমাণে শীতকালীন সরবরাহ আটকে আছে। ইসরাইলকে নিরাপদ, দ্রুত এবং বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, ‘অগ্রগতি সত্ত্বেও গাজায় পাঁচ বছরের কম বয়সী হাজার হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে এবং আরো অনেকেরই যথাযথ আশ্রয়, স্যানিটেশন ও শীতের বিরুদ্ধে সুরক্ষার অভাব রয়েছে।’ তিনি