গাজায় হামলা ও ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের দাবি ইসরাইলি মন্ত্রীদের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েই সামরিক ঘাঁটি নির্মাণে ট্রাম্প
  • গাজায় ৩০০ দিনে অন্তত ৩০০ শিশু নিহত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের রূপরেখা প্রত্যাখ্যান এবং গাজায় পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর দাবি জানিয়েছেন ইসরাইলের একাধিক মন্ত্রী। ইসরাইলি সংবাদপত্র ‘ইসরাইল হায়োম’ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ দাবি তোলা হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

বৈঠকে মন্ত্রী জেভ এলকিন, বেজালেল স্মোটরিচ, ওরিত স্ট্রক ও আভি দিখতার গাজায় দ্রুত নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর আহ্বান জানান। এলকিন বলেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইসরাইল যদি আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু না করে, তাহলে তা কার্যত ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে নেয়ার শামিল হবে। এ সময় তিনি রূপরেখাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যানেরও আহ্বান জানান। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী স্মোটরিচ নেতানিয়াহুকে বলেন, শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, সরকারকে স্পষ্টভাবে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা ঘোষণা করতে হবে। তিনি দাবি করেন, ‘হামাসকে টিকে থাকতে দেয়া যাবে না, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হবে।’ গত সপ্তাহে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন পিস কাউন্সিল জানায়, হামাস দ্বিতীয় ধাপের রূপরেখায় সম্মতি দিয়েছে। তবে ইসরাইল এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ফিলিস্তিনি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ২৫২ ফিলিস্তিনি নিহত এবং চার হাজার ১২০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। বর্তমানে গাজা উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েই সামরিক ঘাঁটি নির্মাণে ট্রাম্প

গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস প্রথম নির্মাণচুক্তি দিতে যাচ্ছে। তবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় ঘরবাড়ি বা মানবিক অবকাঠামো নয়, প্রথম প্রকল্প হিসেবে নেয়া হয়েছে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের উদ্যোগ। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ১৫০ সদস্যের মরক্কোর সেনাদের থাকার জন্য এ ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে নির্মাণকাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্কেল ইন্টারন্যাশনালকে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন সরকারের প্রকল্পে কাজ করেছে। গত জানুয়ারিতে গাজা পুনর্গঠনের তদারকির জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করেন ট্রাম্প। এর চেয়ারম্যান তিনি নিজেই। বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিভ উইটকফ।

বোর্ডের এক কর্মকর্তা ই-মেইলে জানিয়েছেন, বোর্ড এবং গাজা প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের সংগঠন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) কয়েকটি নির্মাণচুক্তি প্রস্তুতের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এখনো কোনো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, সম্ভাব্য একটি চুক্তি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ)-এর জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণসংক্রান্ত। এই বাহিনী গাজার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। তবে গাজার পুনর্গঠন নিয়ে এই উদ্যোগের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হয়েছে। কিন্তু হামাস কিভাবে অস্ত্র জমা দেবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্য দিকে ইসরাইল এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর গাজায় বিমান হামলাও বাড়িয়েছে দেশটি।

৩০০ দিনে অন্তত ৩০০ শিশু নিহত

গাজা উপত্যকায় গত ৩০০ দিনে অন্তত ৩০০ শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। অর্থাৎ এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে একজন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। উপত্যকায় গোলাবর্ষণ ও নৌবাহিনীর হামলাসহ তীব্র সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় বেসামরিক নাগরিকরা হতাহতের শিকার হচ্ছেন। খবর আরব নিউজের। বৃহস্পতিবার ইউনিসেফ জানায়, ৩০০ শিশু নিহত ছাড়াও একই সময়ে আরো শত শত শিশু আহত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দফতর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজার শিশুরা এখনো অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে। অতিরিক্ত ভিড়ের আশ্রয়কেন্দ্র, নিরাপদ পানির সীমিত সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার না থাকায় তাদের জীবন আরো ঝুঁঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ দিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং ইসরাইলি সামরিক অভিযান ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও জীবিকায় ক্রমাগত প্রভাব ফেলছে বলে সতর্ক করেছে ওসিএইচএ।

হেবরনের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকার তুবা নামের একটি ফিলিস্তিনি জনপদে রাতভর ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীরা কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে ১৪ শিশুসহ তিনটি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তারা নিরাপত্তার জন্য আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া হামলায় একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ১০ টন পশুখাদ্য এবং অন্যান্য সম্পদও ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে ওসিএইচএ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের এক হাজার ৩৮০টির বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় হতাহত, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অথবা উভয় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ফিলিস্তিনের ২৫০টি জনপদে প্রতিদিন গড়ে ছয় থেকে সাতটি এমন ঘটনা ঘটেছে।

ওই সময়ের মধ্যে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং সংশ্লিষ্ট চলাচল-নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ওসিএইচএ। ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং তাদের ওপর হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

কালান্দিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার

দুই দিনের সামরিক অভিযান শেষে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কালান্দিয়া শরণার্থী শিবির ও কাফর আকাব শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে ইসরাইল। অভিযানে অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনি আহত এবং ৭০ জনের বেশি গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানিয়েছে জেরুসালেম গভর্নরেট। দুই দিনের সামরিক অভিযান শেষে কালান্দিয়া শরণার্থী শিবির ও কাফর আকাব শহর থেকে ইসরাইলি সেনারা সরে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আলজাজিরা। অভিযানের সময় ইসরাইলি বাহিনী কয়েকটি বাড়ি দখল করে সেগুলোকে সামরিক ব্যারাক ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে রূপান্তর করেছিল। অভিযান চলাকালে বেশ কয়েকটি দোকান ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে গভর্নরেট। পাশাপাশি কয়েক ডজন বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ করা হয়েছে।

গাজায় সেনা পাঠাবে উগান্ডা

গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীতে সেনা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে উগান্ডা। দেশটির সরকার এ বিষয়ে সংসদের অনুমোদন চাওয়ার পর বৃহস্পতিবার আইনপ্রণেতারা প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছেন। এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স ফর গাজায় যোগ দিতে আগ্রহী উগান্ডা। এর আগে মরক্কোও এই বাহিনীতে সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে উগান্ডা কেন এই মিশনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এর বিনিময়ে কোনো ধরনের চুক্তি বা সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে দেশটির বিরোধী দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে গাজার মতো সঙ্ঘাতপূর্ণ অঞ্চলে উগান্ডার সেনারা কোন পক্ষের হয়ে দায়িত্ব পালন করবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।