ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সীমিত সুযোগের কারণে দেশে আবারো আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বন্ধকী ব্যবসা। বিশেষ করে সোনা, জমির দলিল, দোকানের কাগজপত্র কিংবা অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ নেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট, ঋণ বিতরণে কঠোরতা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থবাজারের বিস্তার সাধারণ মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ মফস্বল শহরগুলোতেও ব্যক্তিগত বন্ধকী ঋণদাতা এবং মহাজনি ঋণব্যবস্থার বিস্তার ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে মাসিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদে অর্থ ধার দেয়া হচ্ছে, যা বার্ষিক হিসাবে ৬০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বন্ধক রাখা সম্পদ হারানোর চরম ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
খেলাপি ঋণের প্রভাব ও আনুষ্ঠানিক ঋণে অনীহা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ চার লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে অধিক সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে এখন জামানত, আয়কর নথি, ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক হিসাবসহ নানা ধরনের নথিপত্রের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা প্রান্তিক মানুষের পক্ষে এসব শর্ত পূরণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে তারা বিকল্প হিসেবে স্থানীয় বন্ধকী ব্যবসায়ী বা মহাজনদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবু সাঈদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ব্যবসার মূলধন সঙ্কট কাটাতে ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করেছিলাম। কয়েক মাস অপেক্ষা করেও ঋণ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে দুই লাখ টাকা ধার নিতে বাধ্য হই। এখন মাসে ৬ শতাংশ হারে সুদ দিতে হচ্ছে। ব্যাংক ঋণ পেলে এত বেশি সুদ গুনতে হতো না, কিন্তু ব্যবসা বাঁচাতে এছাড়া পথ ছিল না।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান, গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক আনিছুর রহমান। পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে তিনি স্থানীয় এক ঋণদাতার কাছে জমির দলিল বন্ধক রেখে এক লাখ টাকা নিয়েছেন। আনিছুর নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এখন ঋণের চেয়ে সুদের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। সময়মতো টাকা শোধ করতে না পারলে জমি হারাতে হতে পারে।’
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও এসএমই খাতের সঙ্কট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি চাপও বন্ধকী ঋণের চাহিদা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছর ধরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে, যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ শতাংশও অতিক্রম করেছে। ফলে নিম্নœ ও মধ্য আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সংসার চালানো, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং ব্যবসায়িক ব্যয় মেটাতে অনেকেই এই অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
অন্য দিকে, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং ঋণপ্রাপ্তির জটিলতার কারণে এই খাতটি বড় ধরনের চাপে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রবাহ কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি। পর্যাপ্ত জামানত দিতে না পারায় অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ ও নজরদারির অভাব
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, “অনানুষ্ঠানিক ঋণবাজার নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় জমি বন্ধক এবং শহরাঞ্চলে স্বর্ণ বন্ধকের প্রবণতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি ছাড়াই ঋণ দেয়া হচ্ছে। ফলে আইনি জটিলতা দেখা দিলে ঋণগ্রহীতারা চরম দুর্বল অবস্থানে থাকেন।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণাতেও দেখা গেছে, দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের একটি বড় অংশ জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে, যার সুদ সাধারণ ব্যাংক ঋণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ব্যাংকিং সেবার আওতা বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে নতুন ঋণ বিতরণে সতর্কতা বাড়িয়েছে। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত কঠোরতাও ঋণপ্রবাহ কিছুটা সীমিত করেছে। তবে আনুষ্ঠানিক খাতে অর্থায়ন সহজ না হলে অনানুষ্ঠানিক ঋণবাজার আরো বিস্তৃত হবে।
তিনি আরো যোগ করেন, বন্ধকী ব্যবসার বড় একটি অংশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে সুদের হার লিখিতভাবে উল্লেখ না থাকায় ঋণগ্রহীতারা সুদের প্রকৃত হিসাব বুঝতে পারেন না। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে ঋণের বোঝা কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং বন্ধক রাখা সম্পদ ফেরত পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। নিবন্ধিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে পরিচালিত এসব ব্যবসায় প্রতারণা ও সম্পদ আত্মসাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
উত্তরণের উপায়
পরিস্থিতি মোকাবেলায় অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- ক্ষুদ্রঋণ ও এসএমই অর্থায়ন দ্রুত সম্প্রসারণ করা; কৃষিঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পসুদে জরুরি ঋণসুবিধা চালু করা; ব্যাংক ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া থেকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কড়াকড়ি কমানো এবং দেশের আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রবাহ বাড়ানো।
অন্যথায় বন্ধকী ব্যবসা ও মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরো বৃদ্ধি পাবে, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও গভীর করতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরো বেশি মানুষ সম্পদ বন্ধক রাখতে বাধ্য হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় জাতীয় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিতে পারে।



