ভোটের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীরা

সংবিধানে যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, সেখানে প্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতাকে বৈষম্যমূলক বলে মন্তব্য করেছেন মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাদের অভিযোগ, দলীয় প্রার্থীদের জন্য যেখানে এ ধরনের শর্ত নেই, সেখানে স্বতন্ত্রদের ওপর এই বাড়তি চাপ সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।

হামিদ সরকার
Printed Edition

  • ‘এই ইসির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’ : স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ

  • স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হেনস্তার কোনো খবর কানে আসেনি : ইসি সচিব

সংবিধানে যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, সেখানে প্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতাকে বৈষম্যমূলক বলে মন্তব্য করেছেন মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাদের অভিযোগ, দলীয় প্রার্থীদের জন্য যেখানে এ ধরনের শর্ত নেই, সেখানে স্বতন্ত্রদের ওপর এই বাড়তি চাপ সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।

এদিকে শুধু আইনি কাঠামো নয়, ভোটের মাঠে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ নিয়েও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীরা। তাদের মতে, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় যেভাবে হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, তাতে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা কঠিন হবে। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হেনস্তার কোনো খবর আমার কানে আসেনি।’

আপিল গ্রহণের প্রথম দিনেই অভিযোগের ঝড় : রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন চত্বরে গতকাল সকালে আপিল গ্রহণের প্রথম দিনেই এসব অভিযোগ সামনে আসে। আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বাতিল ও বৈধতার বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণ করবে ইসি।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট দুই হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন এবং এক হাজার ৮৪২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।

উল্লেখ্য, গত রোববার মানিকগঞ্জ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেতা আতাউর রহমান আতা হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে, যা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এক শতাংশ স্বাক্ষর সংবিধানসম্মত নয় : আপিল করতে আসা পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম ফজলুল হক বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেয়ার বিধান সংবিধানসম্মত নয়। দলীয় প্রার্থীদের জন্য যখন এমন বাধ্যবাধকতা নেই, তখন আমাদের ক্ষেত্রে কেন থাকবে?’

তিনি জানান, এক শতাংশ স্বাক্ষর সংগ্রহে তার মোট ২৫৬ পৃষ্ঠা ছিল। এর মধ্যে ২৮টি পাতায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজের স্বাক্ষর বাদ পড়ায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ‘বাকি সব পাতায় আমার স্বাক্ষর ছিল। এই কারণে মনোনয়ন বাতিল হওয়া ন্যায়সংগত নয়,’ বলেন তিনি।

তবে তিনি মনে করেন, এখনো পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো। ‘সব প্রার্থী মাঠে নামার পর দলীয় প্রার্থীদের চাপে স্বতন্ত্রদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। প্রকৃত চিত্র ২০ জানুয়ারির পর পরিষ্কার হবে,’ যোগ করেন তিনি।

হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ : রাজবাড়ী-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে আমার ওপর হামলা হয়। এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের কাগজপত্রসহ আমার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া হয়। ফলে সেদিন মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়েই যদি একজন প্রার্থীর নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে ভোটের মাঠে আমরা কিভাবে নিরাপদ থাকব?’ এ ঘটনায় তিনি মামলা করেছেন বলেও জানান। তার অভিযোগ, ‘এই নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।’

ছোট দলের প্রার্থীদের অবস্থান : ঢাকা-১৮ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো: নেয়ামত উল্লাহ (আমিন)-এর পক্ষে আসা সোলায়মান সাদ বলেন, প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষরের স্থানে ভুলবশত প্রার্থীর স্বাক্ষর থাকায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

মাদারীপুর-৩ আসনে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম পাপন বলেন, নিজের ভোটার নম্বর উল্লেখ না করায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। ‘আপিল করেছি। আশা করছি প্রার্থিতা ফিরে পাবো,’ বলেন তিনি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সব প্রার্থী মাঠে নামলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে। এ জন্য ইসিকে কঠোরভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

জয়পুরহাট-১ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো: আনোয়ার হোসেন জানান, সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের কলাম পূরণ না করায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, যা তিনি আইনজীবীর ভুল বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে প্রশাসন বিএনপিমুখী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, এই অবস্থায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা ইসির বড় চ্যালেঞ্জ।

ইসি সচিবের বক্তব্য : স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওপর হামলা ও হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে আসেনি। যদি কোথাও অসঙ্গতি হয়ে থাকে, রিটার্নিং কর্মকর্তা বিষয়টি দেখবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আপিল করলে শুনানিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অনুমানভিত্তিক বক্তব্য দেয়ার পক্ষপাতী নই।’

দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন বৈধ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে সংবাদ এলে নিশ্চয়ই আপিল হবে। ৯ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করি।’

আপিল নিষ্পত্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের অডিটোরিয়ামে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। হলফনামা, এক শতাংশ স্বাক্ষরসহ যেকোনো বিষয়ে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা আপিল করতে পারবেন এবং যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

রিটার্নিং অফিসারের রায়ের বিরুদ্ধে ৪২ জনের আপিল : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন ৪২ জন। আপিল গ্রহণের প্রথম দিনে গতকাল সংক্ষুব্ধরা এই আপিল করেন। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে জমা পড়েছে ৪১টি আপিল এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে জমা পড়েছে একটি আপিল বলে ইসির জনসংযোগ (পরিচাালক) রূহুল আমীন মল্লিক জানান।

যেসব আসনে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে সেগুলো হলো : আসন লালমনিরহাট-১ (১টি), রংপুর-১ (১টি), রংপুর-৪ (১টি), বগুড়া-৩ (১টি), চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (১টি), রাজশাহী-৫ (১টি), নাটোর-১ (১টি), যশোর-৫ (১টি), নড়াইল-১ (১টি), বাগেরহাট-১ (১টি), খুলনা-৬ (১টি), পটুয়াখালী-৩ (১টি), টাঙ্গাইল-১ (১টি), কিশোরগঞ্জ-১ (১টি), কিশোরগঞ্জ-৪ (১টি), মুন্সীগঞ্জ-৩ (১টি), ঢাকা-৩ (২টি), ঢাকা-৯ (১টি), ঢাকা-১৮ (১টি), গাজীপুর-১ (১টি), গাজীপুর-২ (১টি), গাজীপুর-৩ (১টি), গাজীপুর-৫ (২টি), নরসিংদী-১ (১টি), নরসিংদী-৪ (১টি), নারায়ণগঞ্জ-৪ (১টি), ফরিদপুর-৪ (১টি), গোপালগঞ্জ-২ (১টি), মাদারীপুর-২ (১টি), শরীয়তপুর-১ (৩টি), শরীয়তপুর-৩ (১টি), কুমিল্লা-১ (১টি), কুমিল্লা-৯ (১টি), চাঁদপুর-২ (১টি), ফেনী-১ (১টি), চট্টগ্রাম-১১ (১টি) এবং কক্সবাজার-২ (১টি)।

অন্য দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে একটি আপিল আবেদন জমা পড়েছে। নির্বাচন কমিশনে আপিল দায়ের কার্যক্রম চলবে আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত।