সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তবতার ফারাক নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন

হারুন ইসলাম
Printed Edition

সংস্কার না হলে অস্থিরতা বাড়বে বলে বিশ্লেষকদের সতর্কতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে তা শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের বার্তা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হয় ‘জুলাই সনদ’, যা রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কার্যক্রম ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠছে- এই সনদের চেতনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতায় এসে বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে রাজনীতিবিদ, সরকারদলীয় নেতা ও বিশ্লেষকদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। কেউ দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন, আবার কেউ বাস্তবতার নিরিখে ধাপে ধাপে এগোনোর কথা বলছেন। সাম্প্রতিক সময়ের এসব বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে- জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য থাকলেও বিষয়টি এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘জুলাই সনদ ছিল একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য, যা রাজনৈতিক দলগুলো জনচাপের মুখে মেনে নিয়েছিল। গণভোটে মানুষ সনদের পক্ষে মত দিয়েছে, কিন্তু সরকার এখনো সেটিকে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রাখছে না। এতে জনগণের প্রত্যাশা ভঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নতুন সরকার অর্থনীতি ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সেই স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না।’ তিনি মনে করেন, সংসদের প্রথম দুই অধিবেশনে সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকা একটি নেতিবাচক সঙ্কেত।

নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম দুই অধিবেশনে আইনশৃঙ্খলা, বাজেট ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা হলেও জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব- সংবিধান সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও উচ্চকক্ষ গঠন- নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সংবিধানের দোহায় দিয়ে কিছু প্রস্তাব নাকচ করার অভিযোগও উঠেছে।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সংসদে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু তা কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে না। এতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগও জোরালো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দলটি নির্বাচনের আগে সনদের প্রতি সমর্থন জানালেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে তাদের ভেতরে দ্বিধা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বিষয়ক সংস্কারে দ্বিধাগ্রস্ত। এখনো সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’

প্রধান বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামীর আমির সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ জনগণের রায়ের প্রতিফলন। গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।’ তার অভিযোগ, সরকার অযথা সময়ক্ষেপণ করছে, যা জনগণ মেনে নেবে না।

অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অংশীজন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দ্রুত সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। দলের আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো গড়িমসি জনগণ মেনে নেবে না। যারা জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করবে না, তারা রাজনীতিতে টিকতে পারবে না।’ তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি এখন বাস্তবায়নের সময়; অন্যথায় তা হবে আন্দোলনের সাথে প্রতারণা।

তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, তারা সনদের মূল চেতনার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবায়নে সময় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের চেতনা আমরা অস্বীকার করি না। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা আছে- সবকিছু একসাথে করা সম্ভব নয়। সংসদের মাধ্যমেই ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে।’

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গণভোটের ফল আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রয়োজন, সেই কাজ চলছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জুলাই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল। তবে এটি বাস্তবায়নে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি- সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না।’ তিনি দাবি করেন, সরকার সময়ক্ষেপণ করছে না; বরং টেকসই সংস্কারের জন্য ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম মনে করেন, ‘সরকার বর্তমানে এক ধরনের ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতিতে রয়েছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ধীরে এগোতে চায়। কিন্তু এতে জনগণের যে তাড়না ছিল, তা ম্লান হয়ে যেতে পারে।’

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন একটি ‘ট্রানজিশনাল’ পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে জুলাই আন্দোলনের চেতনা, অন্যদিকে প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতি- এই দুইয়ের টানাপড়েন ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। দ্রুত ও দৃশ্যমান সংস্কার না এলে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জুলাই সনদ এখন শুধু একটি দলিল নয়, এটি জনগণের প্রত্যাশার প্রতীক। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে রাজনীতিতে আবারো বড় ধরনের পরিবর্তনের ঢেউ আসতে পারে- এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।