নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মাদক চোরাচালানের অভিযোগে করা মামলায় ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে জিজ্ঞাবাসাদ করা হচ্ছে। শনিবার শেষ রাতে রাজধানী কারাকাস থেকে স্ত্রীসহ তাকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে একটি আটককেন্দ্রে রেখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
কারাকাসসহ ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় শনিবার ভোরে ‘বড় পরিসরে’ হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোস্যালে দেয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য জানান।
এরপর যুদ্ধজাহাজটি মাদুরোকে কিউবার গুয়ানতানামো বে মার্কিন নৌঘাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে উড়োজাহাজে মাদুরোকে নেয়া হয় নিউ ইয়র্কে।
ভেনিজুয়েলায় আবার হামলার হুমকি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর : ভেনিজুয়েলায় আবার হামলা চালানো হতে পারে বলে হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ভেনিজুয়েলার পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর। মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনো ওই অঞ্চলে রয়েছে এবং তারা যা চায় তা না পেলে ভেনিজুয়েলায় আবার হামলা চালানো হতে পারে।
এ দিকে মাদুরোকে আটকের পর ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজে। তবে ডেলসি বলেছেন, তিনি এখনো মনে করেন মাদুরো ভেনিজুয়েলার বৈধ নেতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। মূলত ডেলসি রদ্রিগেজের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভেনিজুয়েলায় আবার হামলার হুমকি দিয়েছেন।
নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন কারাগারে মাদুরো : যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারাগারটি এর আগে ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং পি ডিডির মতো হাই-প্রোফাইল বন্দীদের রাখার জন্য আলোচনায় এসেছিল।
জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে ‘এমডিসি’ মাদক ও অস্ত্র মামলার মুখোমুখি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে এই কারাগারেই রাখা হবে। তবে মাদুরোর স্ত্রীর বর্তমান অবস্থা বা তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নিউ ইয়র্ক সিটির একমাত্র ফেডারেল কারাগার হিসেবে পরিচিত এই ‘এমডিসি’। হাই-প্রোফাইল বন্দীদের রাখার কারণে এটি প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে আসে।
এই কারাগারটির বন্দীদের জন্য অত্যন্ত ‘ভয়ঙ্কর’ হিসেবেও পরিচিত। নোংরা পরিবেশ, চরম সহিংসতা এবং কর্তৃপক্ষের অবহেলার বহু অভিযোগ রয়েছে এই ডিটেনশন সেন্টারের বিরুদ্ধে। এমনকি এক বন্দীকে কয়েকবার ছুরিকাঘাত করার পর চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো ২৫ দিন নির্জন সেলে আটকে রাখার মতো অমানবিক অভিযোগও রয়েছে এই কারাগার নিয়ে।
ট্রাম্প জানান, ভেনিজুয়েলা পরিচালনার জন্য তিনি তার মন্ত্রিসভা থেকে লোক নিয়োগ দিচ্ছেন, তবে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি। তিনি সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘আমরা সরাসরি লড়াইয়ে নামতে ভয় পাই না।’ তবে ভেনিজুয়েলার বিরোধী দল ক্ষমতায় বসুক, ট্রাম্প এমনটি চান না বলে মনে হচ্ছে। তিনি বরং মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সাথে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য যে ভেনিজুয়েলার বিশাল তেলখনি, তাও এখন স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাবে, কোটি কোটি ডলার খরচ করে ভেঙে পড়া অবকাঠামো মেরামত করবে। আমরা সেখান থেকে প্রচুর তেল বিক্রি করব।’
গত বছর শান্তিতে নোবেল জয়ী বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো সামাজিক মাধ্যমে লিখেন, ‘মুক্তির সময় এসেছে।’ মাচাদো ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু ট্রাম্প ডেলসি রদ্রিগেজের প্রশংসা করে বলেন, ‘ভেনিজুয়েলাকে আবার মহান করার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করতে তিনি আগ্রহী।’
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন। বেইজিং অবিলম্বে মাদুরোর মুক্তি দাবি করে বলেছে, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ফ্রান্সও সতর্ক করে বলেছে, বাইরে থেকে কোনো সমাধান চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন মানা হয়নি। ভেনিজুয়েলার অনুরোধে সোমবার নিরাপত্তা পরিষদ এই সঙ্কটের বিষয়ে জরুরি বৈঠক ডাকবে।
মার্কিন জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ১৫০টি যুদ্ধবিমান এই অভিযানে অংশ নেয়। গোয়েন্দারা কয়েক মাস ধরে মাদুরোর দৈনন্দিন অভ্যাস, এমনকি তিনি কী খান এবং কী পোষেন তাও পর্যবেক্ষণ করেছেন। অভিযানে কোনো মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়নি। তবে ট্রাম্প দাবি করেন, মাদুরোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অনেক কিউবান নাগরিক নিহত হয়েছেন।
২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মাদুরো দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তেল সম্পদ দখলের জন্য সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে আসছিলেন। বর্তমানে কারাকাসের রাজপথ থমথমে। সেখানে বিভিন্ন সরকারি ভবনের সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং শহরজুড়ে পোড়া গন্ধ ও ধোঁয়া উড়ছে।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার আহ্বান চীনের
যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। পাশাপাশি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের জোরপূর্বক আটককে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক আটক এবং দেশ থেকে বের করার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সাথে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি এবং জাতিসঙ্ঘ সংস্থার উদ্দেশ্য ও নীতির পরিপন্থী।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে, ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাতের চেষ্টা বন্ধ করতে এবং সব বিষয় আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করার আহ্বান জানাচ্ছে।’
ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন দেশটির জনগণ : মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন দেশটির জনগণ। এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘জোরপূর্বক আটকের’ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিবিসির মার্কিন সহযোগী সিবিএস নিউজের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আমেরিকার জন্য সেরাটাই চিন্তা করব। আমরা দেখেছি এমন নারী-পুরুষ রয়েছেন যারা আমাদের দেশের স্বার্থে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
ভেনিজুয়েলা নিয়ে পরবর্তী কী সিদ্ধান্ত হবে এবং সেটি কংগ্রেসে অনুমোদন পাবে কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে পিট হেগসেথ বলেছেন, এটা ছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি অভিযান। আমরা এর সাথে কংগ্রেসকেও সম্পৃক্ত রাখবো। তিনি আরো বলেন, এরপর কী হবে, তা নির্ধারণ করবেন ভেনিজুয়েলার জনগণ। তবে নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির দিক থেকে শেষ পর্যন্ত আমেরিকা এতে উপকৃত হবে। আমরা বিশ্বাস করি, ভেনিজুয়েলার মানুষও এতে লাভবান হতে পারে।
ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ যুদ্ধের শামিল : মামদানি
নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এই অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্টকে বন্দী করা হয়েছে। এই বিষয়টিকে মামদানি ‘যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম হাফিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মামদানি লিখেছেন, ‘আজ (শনিবার) সকালে আমাকে জানানো হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দী করেছে। তাদের নিউ ইয়র্ক সিটির ফেডারেল হেফাজতে কারারুদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর একতরফা আক্রমণ চালানো যুদ্ধের শামিল এবং এটি ফেডারেল ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই নগ্ন আকাক্সক্ষা শুধু বিদেশের মাটিতেই প্রভাব ফেলে না বরং সরাসরি নিউ ইয়র্কবাসীর ওপরও এর আঁচ এসে পড়ে।’
‘বিতর্কিত সামরিক অভিযানের’ মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতারের ঘটনায় বিশ্বরাজনীতি এখন দুই ভাগে বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বইছে সমালোচনার ঝড়, আবার অনেক দেশ একে স্বৈরাচারের পতন ও ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে অভিহিত করে সরাসরি ওয়াশিংটনের পক্ষ নিয়েছে।
লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ ও ইউরোপীয় মিত্ররাই ওয়াশিংটনকে সমর্থন দিচ্ছে। সরাসরি পক্ষ নিয়েছে ইসরাইল, আর্জেন্টিনা, আলবেনিয়া, কসোভো ও কানাডা। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ ও ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে রাশিয়া, চীন, ইরান, কিউবা ও উত্তর কোরিয়া। ব্রাজিল ও কলম্বিয়াও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে।



