মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ
দেশের সবচেয়ে বড় ঈদজামাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। জেলা শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত এই ঈদগাহে আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঐতিহ্য অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে পরপর তিনবার বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হবে। শোলাকিয়ায় এবারে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৯৯তম ঈদজামাতের ইমামতি করবেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
ঈদজামাতকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ও সেবামূলক প্রস্তুতি। ঈদের দিন ঈদগাহে প্রবেশের প্রতিটি পথে বসানো হবে তল্লাশি চৌকি। মাঠ ও আশপাশ এলাকায় মোতায়েন থাকবে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
নিরাপত্তা জোরদারে ঈদগাহ মাঠে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। জামাত চলাকালে চারটি ড্রোন দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে। তিনটি ‘আর্চওয়ে’র মাধ্যমে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি শেষে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ ও প্রয়োজনীয় মোবাইল ফোন সাথে রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। ছাতা, ব্যাগ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদগাহ মাঠ পরিষ্কার করে সারির বা কাতারের দাগ কাটা হয়েছে। স্থায়ী অজুখানার পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে অতিরিক্ত অজুখানা। সুপেয় পানির জন্য বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক। এ ছাড়া রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত অস্থায়ী টয়লেট।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে চালু করা হয়েছে দু’টি বিশেষ ট্রেন- ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-১’ ও ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-২’। ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-১’ ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে সকাল ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে। ফেরার পথে দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বেলা ২টায় ভৈরব পৌঁছাবে। অন্যদিকে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-২’ ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে সকাল সাড়ে ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে। ফেরার পথে বেলা ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বিকেল ৩টায় ময়মনসিংহ পৌঁছাবে।
গতকাল সোমবার জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন জানান, দেশ-বিদেশ থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য আজিমউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়, শোলাকিয়া কুমুদিনী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাগে জান্নাত নূরানী মাদরাসায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে।
একই দিন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে এক হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ঈদের দিন মাঠ ও আশপাশ এলাকায় পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হবে।
র্যাব-১৪ এর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অধিনায়ক নয়মুল হাসান জানান, নাশকতা প্রতিরোধে র্যাবের সদস্যরা নিজস্ব ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। ওয়াচ টাওয়ার, ড্রোন ও বাইনোকুলারের মাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল আরো জোরদার করা হবে। ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনেও র্যাব মোতায়েন থাকবে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক কাহিনী। এক মতে, মুঘল আমলে এ এলাকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ‘শ লাখ’ টাকা (অর্থাৎ এক কোটি টাকা)। সেখান থেকেই ‘ শোলাকিয়া’ নামের উৎপত্তি। আরেক মতে, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মুসল্লি একসাথে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। এরপর থেকেই এটি ‘শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
উল্লেখ্য, প্রায় ১৫ বছর পর ২০২৫ সালে মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে শোলাকিয়া ঈদগাহের স্থায়ী ইমাম হিসেবে পুনর্বহাল করা হয়। ঈদগাহ কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে পুনরায় দায়িত্ব দেয়া হয়। গত ঈদুল ফিতরেও শোলাকিয়ায় ব্যাপক মুসল্লির উপস্থিতি ছিল। এবার ঈদুল আজহার জামাতে রেকর্ডসংখ্যক মুসল্লির সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।



