মধ্যপ্রাচ্যের বহু মুসলিম দেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বিদেশী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে, যেমন কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা। এসব ঘাঁটি স্থাপনের মূল যুক্তি ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই সাথে সম্ভাব্য হুমকি থেকে দেশগুলো রক্ষা করা। এর বিনিময়ে বিপুল প্রতিরক্ষা চুক্তি ও অস্ত্র ক্রয়ের মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল এ নিরাপত্তা কাঠামো কতটা স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সঙ্ঘাতে দেখা গেছে, সঙ্কট দেখা দিলে বিদেশী শক্তিগুলো প্রায়ই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে যেসব দেশ বিদেশী সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশা করেছিল, তারা অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়ে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাগুলো এ বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। যখন বড় শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন আঞ্চলিক দেশগুলো সরাসরি সঙ্ঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে। এ পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, কেবল বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বর্তমান সঙ্কটময় সময়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার জন্য বহিরাগত শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বহু দশক ধরে এ অঞ্চলে বিদেশী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব ব্যবস্থার অনেকগুলো মূলত বহিরাগত শক্তির কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় বেশি কার্যকর; বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়। এ বাস্তবতা এখন আঞ্চলিক নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, তাদের নিরাপত্তা কাঠামো কি বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিজেদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সার্বভৌমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে।
একটি সম্ভাব্য পথ হলো মুসলিম দেশগুলোর ধীরে ধীরে নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশী সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির পুনর্বিবেচনা করা। এ প্রেক্ষাপটে মুসলিম দেশগুলো যদি আঞ্চলিক সংলাপের মাধ্যমে বিদেশী সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু করে, তবে ধীরে ধীরে একটি স্বনির্ভর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর অর্থ এ নয় যে, হঠাৎ করে বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে সঙ্ঘাতে জড়াবে; বরং এটি হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপান্তর, যেখানে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। এ ছাড়া বহিরাগত নির্ভরতা কমানো হবে। একই সাথে আঞ্চলিক উত্তেজনা, বিশেষত ইরান ও কিছু আরব দেশের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এ পথ বন্ধ হয়ে যায় বা বিঘ্নিত হয়, তবে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। তাই এ কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র আরব দেশ ও ইরান একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে উত্তেজনা অনেকটা কমতে পারে। পারস্পরিক অ-আক্রমণ চুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, সঙ্কট মোকাবেলায় যোগাযোগব্যবস্থা এবং আস্থা বৃদ্ধির উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা গেছে, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোও সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। গত কয়েক দশকের ইতিহাস এ সত্যকে আরো স্পষ্ট করেছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। ২০১১ সালে লিবিয়ার শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর দেশটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ ও বিভক্তির মধ্যে রয়েছে। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধের পরও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সিরিয়াতেও দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত একটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপ অনেক সময় রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়। সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে।
এমন প্রেক্ষাপটে মুসলিম দেশগুলোর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে— নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় তারা কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারছে? মুসলিম বিশ্ব ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত, সম্পদে সমৃদ্ধ এবং জনসংখ্যায় শক্তিশালী। প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের এ বিশ্বে বিপুল অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও মানবসম্পদ আছে। বিশ্বের প্রমাণিত তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে অবস্থিত। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল একাই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এ বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে কাজ করছে। রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বহিরাগত প্রভাবে অনেক সময় যৌথ উদ্যোগ গড়ে ওঠে না। ফলে মুসলিম বিশ্বের শক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একটি সমন্বিত কৌশলগত অবস্থান গড়ে ওঠে না।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন মুসলিম সমাজ ঐক্যবদ্ধ ছিল তখন তারা বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে। আব্বাসীয় খেলাফতের সময় বাগদাদ ছিল জ্ঞান ও বিজ্ঞানের কেন্দ্র। আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনের সময় বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও স্থাপত্যে অসাধারণ উন্নতি হয়েছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের সময় ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল একটি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ছিল। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দেখায়, ঐক্য ও সমন্বয় শক্তির ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমান বিশ্বে অবশ্য সেই ধরনের সাম্রাজ্য বা কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান বা আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক সংগঠনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ আরো কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারে। মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বা আন্তঃআঞ্চলিক জোট গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ জোটের মূল লক্ষ্য হতে পারে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সমন্বয়, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কূটনৈতিক ঐক্য। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ পশ্চিমা অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়াতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৌশলগত দূরদর্শিতা। যদি মুসলিম দেশগুলো নিজেদের পারস্পরিক বিভাজন দূর করে সহযোগিতার পথ বেছে নেয়, তবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে অঞ্চলটি বারবার সঙ্ঘাতের ঝুঁকিতে থাকবে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়, বিভক্ত শক্তি দুর্বল হয়; কিন্তু ঐক্যবদ্ধ শক্তি সম্মান অর্জন করে। গতকাল ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান বা সিরিয়া ছিল; আজ ইরান সঙ্কটে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। তাই এখনই সময় বাস্তবতা উপলব্ধি করার এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি সমন্বিত কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার।
এই ঐক্য সামরিক প্রতিযোগিতার জন্য নয়; বরং নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য। শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতা সঙ্ঘাত প্রতিরোধ করতে পারে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। একই সাথে মুসলিম বিশ্বকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। আজকের বিশ্বে টেকসই নিরাপত্তা আসে সহযোগিতা, দূরদর্শিতা এবং ঐক্যের মাধ্যমে।
মুসলিম দেশগুলো যত দ্রুত এ বাস্তবতা উপলব্ধি করবে এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট গড়ে তুলবে, তত তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক হবে। ইতিহাস দেখায়, যে অঞ্চলগুলো বিভক্ত থাকে, তারা বহিরাগত প্রভাবের শিকার হয়। যে অঞ্চলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে সহযোগিতা গড়ে তোলে, তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। মুসলিম দেশগুলোর জন্য আজ সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ ও স্বনির্ভর আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]



