রুবী আমাতুল্লা
আমেরিকার আগ্রহে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। সেজন্যই ইরান আমেরিকার দেয়া কোনো শর্ত মানেনি। হরমুজ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আমেরিকার কোনো শর্ত মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে। তথাপি আমেরিকা মরিয়া হয়ে যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়।
ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করবে, প্রতিটি জাহাজের জন্য ২০ লাখ ডলার টোল নিচ্ছে, ফলে মাসিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের তেল আয়ের ওপর অতিরিক্ত ৯০ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। ইসলামাবাদে দুই পক্ষের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এখন দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের দিকে।
ইসরাইল-নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ৩৯ দিনে ৪২ বিলিয়ন ডলার অপচয় করেছে। বিনিময়ে আমেরিকা হারালো মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য। ইতঃপূর্বে আমেরিকার অনেকবার বিপর্যয় এসেছে এ কারণে যে, যখন কূটনীতি ও গঠনমূলক কাজ সবচেয়ে ফলপ্রসূ, তখন আমেরিকা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক এবং আরো কয়েকবার যখন সফট পাওয়ার অনেক বেশি কার্যকর হতো, ওয়াশিংটন তখন শোষকগোষ্ঠীর প্ররোচনায় সামরিক অভিযানে জড়িয়েছে। কারণ যুদ্ধ শোষকগোষ্ঠীকে লাভবান করে। এবার তারই চূড়ান্ত নজির দেখাল আমেরিকা।
এ বছর ফেব্রুয়ারির শেষদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান ঘোষণা করে যে, ইরান সব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে এবং এটিকে ‘প্রাকৃতিক’ অবস্থায় নামিয়ে আনবে, যা ২০১৫ সালে ইরান ও ওবামা প্রশাসনের সাথে প্রধান বৈশ্বিক শক্তিগুলোর করা Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) চুক্তির চেয়েও ভালো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প JCPOA বাতিল করেছিলেন। দাবি করেছিলেন ইরান তাকে আরো ভালো চুক্তি দিক। যদিও বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞ, এমনকি কিছু ইসরাইলিও, এটিকে একটি শক্ত ও কার্যকর চুক্তি বলে স্বীকার করেছিলেন।
ইরান ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখ রাজি হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি মেনে নিতে। তথাপি, ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানকে বিনা কারণে আক্রমণ শুরু করে। আমেরিকা হারিয়ে ফেলে এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
যুদ্ধের ফলাফলে সমগ্র বিশ্ব ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। আমেরিকা-ইসরাইল একা হয়ে যায়।
গত বছর, ২০২৫ সালের জুনে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন এক সময়ে ইরানে বোমা হামলার সিদ্ধান্ত নেন, যখন আলোচনার মধ্যেই ইরান বড় ধরনের ছাড় দিচ্ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই সুযোগ উপেক্ষা করে ইসরাইলের কথামত ইরানে হামলা করল। তথাপি, যখনই আমেরিকা বোমা হামলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলো, ইরান তা মেনে নিলো।
আট মাস পর, ফেব্রুয়ারি ২৭-এর চুক্তিতে ইরানের বড় ধরনের ছাড়ের জবাবে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি উপেক্ষা করে ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বিচারে ইরানে বোমা হামলা শুরু করে।
এমন ব্যয়বহুল ও উল্টো ফলদায়ক পদক্ষেপ নেয়ার কারণ বোঝা কঠিন নয়। সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স ও ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী অভিজাত গোষ্ঠী- এর সাথে যোগ হয় সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে অঞ্চলে আধিপত্য বাড়ানোর ইসরাইলের দীর্ঘদিনের প্রবণতা। জাতিসঙ্ঘ সনদের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক আইনের ১০০ জন বিশেষজ্ঞ একে ‘আগ্রাসনের যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
অতীতে শিক্ষা হয়নি
ওয়াশিংটন যেন নিজের অতীত উপেক্ষা করছে- শীতল যুদ্ধের সময় যেমন ভুল করেছে, আবার ৯/১১-এর পরও একই ভুল পুনরাবৃত্তি করছে এবং একই ধরনের পরিণতি ডেকে আনছে।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও আমেরিকার কঠোর শক্তির ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং কূটনীতি বা সফট পাওয়ারকে অবমূল্যায়ন- সবসময়ই বিপর্যয়, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উল্টো ফলদায়ক পরিণতি ডেকে এনেছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অধিকাংশ যুদ্ধে জিতেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ হারায় এবং সুপার পাওয়ার হিসেবে যে লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিল তার একটিও অর্জন করতে পারেনি। দেড় দশকব্যাপী এই যুদ্ধে ৬০ হাজার আমেরিকান এবং ৩০ লাখ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নিহত হয়। আমেরিকা তার নৈতিক অবস্থান ও বিশ্ব নেতৃত্ব হারায়। ২০শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উড্রো উইলসন ও ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের দূরদর্শী নেতৃত্বে যে সুপার পাওয়ার বিশ্বজুড়ে আস্থা অর্জন করেছিল, সেটিই বিশ্বে খলনায়ক ও দুষ্ট সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়।
৯/১১-পরবর্তী দুই দশকের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কর্মসূচিতেও আমেরিকা প্রায় সব যুদ্ধ জিতেছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।
আমেরিকান করদাতাদের ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পর ৪,৪০০ আমেরিকান লাশের ব্যাগে দেশে ফেরে। ইরাক ও আফগানিস্তান ধ্বংসস্তূপ ও বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। আমেরিকা কিছুই অর্জন করতে পারেনি। ২০১২ সালে ইরাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র রেখে যাওয়া এবং ২০২১ সালে তালেবানের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া-এই ছিল পরিণতি। আফগানিস্তানে দুই দশক আগে হামলা চালানো হয়েছিল ‘উগ্র’ গোষ্ঠীকে উৎখাত করে দেশটিকে গণতন্ত্র ও মিত্রে পরিণত করার জন্য। কিন্তু ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর দায়িত্বে থাকা নব্য-রক্ষণশীলরা কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল করতে আগ্রহী ছিল না।
বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ্রি স্যাক্স বারবার উল্লেখ করেছেন যে ৯/১১-এর পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রো-ইসরাইল লবি ‘ক্লিন ব্রেক’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল ইসরাইলবিরোধী রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে ফেলা বা ধ্বংস করা। তালিকায় ছিল লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও ইরান।
এই প্রকল্প ব্যাখ্যা করে, কেন ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে যুদ্ধে টানতে নিরলস চেষ্টা করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগে অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইসরাইল রাজি করাতে পারেনি।
বিশ্ব একটি উসকানিবিহীন যুদ্ধের বিকাশ প্রত্যক্ষ করেছে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে বিশ্বে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ন্যাটো বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মিত্রই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাথে এই যুদ্ধে যোগ দেয়নি। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর ওপর অসাধারণ প্রভাব অর্জন করে। যেসব মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিল, তারা আর নিরাপদ বোধ করছে না। তারা নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে আলোচনা করছে। ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুর সম্প্রসারিত ‘ক্লিন ব্রেক’ প্রকল্প থেকে ওয়াশিংটন কি তাদের রক্ষা করবে? তারা নেসেট সদস্যদের প্রকাশ্যে বলতে শুনেছে, ইরানের পর তুরস্ক পরবর্তী লক্ষ্য। ইসরাইলি পত্রিকা হারেৎজের বিশিষ্ট কলামিস্ট গিদিয়ন লেভি বলেছেন, ‘ইসরাইল ইরানেই থামবে না।’
এছাড়া এখন কোনো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পাচ্ছে না। দুই পরাশক্তিকে মোকাবেলা করে নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে ইরান অসাধারণ শক্তি ও বিশাল আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশ্বের বাকি অংশেও একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। নতুন নিয়ম ও নতুন বাস্তবতাসহ একটি বহুমেরু বিশ্ব গড়ে উঠছে। খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার যুদ্ধের শুরু থেকেই বলেছেন : ‘এটি এক বিশাল ভুল।’ অথবা সম্ভবত এটি ছদ্মবেশে ইরান ও পৃথিবীর জন্য এক আশীর্বাদ।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক



