দীর্ঘ ১৮ বছর পর দেশ যখন তার প্রথম সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন প্রত্যাশার পাশাপাশি কিছু মহলে কাজ করছে অন্যরকম সংশয়। বিশেষ করে দীর্ঘকাল ক্ষমতাসীন থাকা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কাছে নতুন কোনো নির্বাচিত সরকারের সম্ভাবনা মানে এক অজানা অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কা। এ মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’-এর গণভোটকে চ্যালেঞ্জ জানানো। নিবন্ধটি সেই রিট আবেদনের নেপথ্য উদ্দেশ্য এবং এই ক্রান্তিকালে এমন পদক্ষেপের পেছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখার একটি প্রয়াস।
এই রিট পিটিশন দায়ের করেন নাদিম আহমেদ নামের একজন নবীন আইনজীবী। বিচারপতি রাজিক আল জলিলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর বেলা ৩টায় অ্যাডভোকেট চঞ্চল কুমার বিশ্বাস ও অ্যাডভোকেট আসলাম মিয়া পিটিশনটি আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন। আবেদনে নাদিম আহমেদ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর গণভোট– উভয়কে চ্যালেঞ্জ করেন। তার দাবি ছিল, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি এর মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। নাদিম আহমেদের মূল অভিযোগ ছিল, সরকার জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। তার মতে, এটি ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫’-এর ২০ নম্বর বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উল্লিখিত ২০ নম্বর বিধিতে সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবেদনকারীর যুক্তি ছিল, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালিয়ে এ আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। তবে এ অভিযোগের গোড়াতে একটি মৌলিক আইনি সীমাবদ্ধতা সম্ভবত আবেদনকারীর নজর এড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ওই আচরণ বিধিমালাটি মূলত সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলোর আচরণের জন্য প্রণীত। এর পরিধি বা প্রয়োগ কোনোভাবে গণভোট পর্যন্ত বিস্তৃত নয়। অন্য কথায়, রিট আবেদনকারী যে আইনি বিধানের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ তুলেছেন, সেটি জুলাই সনদের গণভোটের ক্ষেত্রে একেবারে প্রযোজ্য ছিল না।
আবেদনটি করার ক্ষেত্রে কেবল আইনি সূক্ষ্মতা নয়; বরং একটি বিশ্বজনীন রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। সারা বিশ্বে গণভোটের সময় ক্ষমতায় থাকা সরকার বা ব্যক্তিরা জনসমক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেনÑ এটি স্বীকৃত রীতি। একে কোনোভাবে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হয় না; বরং এটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক বিতর্কের একটি অংশ। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো যুক্তরাজ্যের ‘ব্রেক্সিট’ গণভোট। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের থেকে যাওয়ার জন্য প্রকাশ্যে ‘রিমেইন’ ক্যাম্পেইনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে গণভোটের ফল যখন তার অবস্থানের বিপক্ষে চলে যায়, তখন তিনি সেই নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ– গণভোটে সরকারের নিজস্ব একটি অবস্থান থাকা এবং তা প্রচার করা কোনো আইনি বা গণতান্ত্রিক বিচ্যুতি নয়।
আদালতকে আইনি সহায়তা দিতে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ‘অ্যামিকাস কিউরি’ (আদালতের বন্ধু) হিসেবে উপস্থিত হন। নাদিম আহমেদের পিটিশন পর্যালোচনা করে তারা জোরালোভাবে বলেন, গণভোটে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফলের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ দিকটি তুলে ধরেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কোনো গতানুগতিক ‘নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নয়।
আওয়ামী লীগ শাসিত একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ সরকারের জন্ম হয়েছে। তাই এ সরকারের ম্যান্ডেট বা জনাদেশ কেবল একটি সংসদ নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
অ্যামিকাস কিউরিরা আরো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, সংবিধান, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের মতো সুদূরপ্রসারী দায়িত্ব এ সরকারের ওপর অর্পিত হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, যাদের প্রস্তাবনাগুলো একত্রিত করে তৈরি হয়েছে ‘জুলাই সনদ’। এ বিশেষ প্রেক্ষাপটে, জুলাই সনদের ওপর আয়োজিত গণভোটে প্রধান উপদেষ্টা এবং তার সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো কেবল স্বাভাবিক নয়; বরং এটি ছিল প্রত্যাশিত।
আদালতে নাদিম আহমেদের আইনজীবীর মৌখিক বক্তব্য এবং রিট আবেদনের লিখিত বয়ানের মধ্যে এক বিস্ময়কর গরমিল লক্ষ করা গেছে। শুনানির সময় তাদের সব যুক্তি মূলত ‘জুলাই সনদ’ গণভোটের বৈধতা ঘিরে আবর্তিত হলেও মূল রিট আবেদনটি ছিল আরো গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সেখানে শুধু গণভোট নয়; বরং ১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন সংসদ নির্বাচনের বৈধতাকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল এবং নির্বাচন ও গণভোট– উভয়ই অবিলম্বে বন্ধ করতে আদালতের কাছে আর্জি জানানো হয়েছিল। বক্তব্যের এ বৈপরীত্য ও অসঙ্গতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, এ পিটিশনের আসল লক্ষ্য কেবল গণভোট ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় নির্বাচন পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিতে একটি ঠাণ্ডামাথার অপপ্রয়াস।
রিট আবেদনটিতে দাবি করা হয়েছিল, এটি ‘জনস্বার্থে’ দায়ের করা হয়েছে। দাবিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ জনস্বার্থমূলক মামলার ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হয়, তিনি কোনো গুপ্ত ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশে নয়; বরং বৃহত্তর জনকল্যাণে উদ্বুদ্ধ হয়ে আদালতে এসেছেন। সহজ কথায় আদালত আশা করেন, আবেদনকারী কেন নিজেকে একজন জনহিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে দাবি করছেন, তার যথাযথ ব্যাখ্যা দেবেন। সেই নিয়মানুযায়ী, নাদিম আহমেদের উচিত ছিল তার অতীতে করা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজ বা কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেয়া; কিন্তু বিস্ময়করভাবে, পুরো আবেদনে তার আগের কোনো জনহিতৈষীমূলক কাজের ন্যূনতম তথ্যও ছিল না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রিটটি দায়ের করেছেন একজন অতি তরুণ ও সদ্য তালিকাভুক্ত আইনজীবী, যার পেশাগত অভিজ্ঞতা নেই বললে চলে। অভিজ্ঞতার এই অভাবই তার আবেদনে থাকা তথ্যগত ঘাটতিগুলো আরো বেশি প্রকট ও সন্দেহজনক করে তুলেছে।
শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এই রিট আবেদনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেন। তিনি যুক্তি দেখান, এই পিটিশনটি সম্পূর্ণ ‘অসার ও তুচ্ছ’ এটি কেবল সে জন্যই খারিজ হওয়া যথেষ্ট নয়; বরং আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করার কারণে আবেদনকারীর ওপর দৃষ্টান্তমূলক বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা উচিত। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর উচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত ওই দিন রিট আবেদনটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দেন। তবে আদালত নাদিম আহমেদের ওপর কোনো আর্থিক জরিমানা আরোপ করা থেকে বিরত থাকেন।
এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি, যার ফলে আদালতের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণগুলো এখনো আমাদের অজানা। তবে রিটটি খারিজ হওয়ার ঠিক পরপর যা ঘটল, তা বেশ বিস্ময়কর। ২৯ জানুয়ারি, অর্থাৎ– আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় নির্বাচন কমিশন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়, যাতে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কোনো প্রচারণায় অংশ না নেন। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ সঙ্গত কারণে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নাদিম আহমেদের মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করা ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। সেই রায়ে এ-সংক্রান্ত আইনি অবস্থানটি অনেক বেশি স্পষ্ট হতে পারত। বিশেষ করে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইনের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে নির্বাচন কমিশন বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
সর্বোপরি বলা যায়, দেশের বর্তমান উত্তপ্ত নির্বাচনী পরিস্থিতি এবং আদালতের প্রতিষ্ঠিত আইনি অবস্থান– যেখানে নির্বাচনকালীন প্রক্রিয়ায় আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না, তা বিবেচনায় নিলে হাইকোর্ট থেকে কোনো অনুকূল আদেশ পাওয়ার আশা করা কখনো বাস্তবসম্মত ছিল না। আবেদনকারী কিংবা তার আইনজীবী, কেউ সম্ভবত গুরুত্বের সাথে বিশ্বাস করেননি যে, এ পর্যায়ে আদালত একটি জাতীয় নির্বাচন বা গণভোট স্থগিত করে দেবেন। আর এখানে সেই অনিবার্য প্রশ্নটি জাগে– তাহলে এই রিট আবেদন কেন করা হয়েছিল? এর উত্তর সম্ভবত এজলাসের বাইরে নিহিত। এতে সন্দেহের অবকাশ কম যে, এই পিটিশনটি মূলত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার একটি হাতিয়ার ছিল। হয়তো এটি করা হয়েছিল আদালত এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব পরীক্ষা করার জন্য একটি পরীক্ষামূলক চাল হিসেবে। এর পেছনে ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষাও থাকতে পারে; অর্থাৎ– সেই বিশেষ রাজনৈতিক শিবিরে নিজের আনুগত্য প্রমাণ করে ভবিষ্যতে জায়গা করে নেয়ার একটি সুদূরপ্রসারী চেষ্টা। কারণ যাই হোক, এ ঘটনাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। যদি ভবিষ্যতে কখনো আওয়ামী লীগের অনুকূলে কোনো রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়, তবে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে নাদিম আহমেদ আবারো আদালতে ফিরবেন। এখন হয়তো আপিল বিভাগে গিয়ে তিনি ২৬ জানুয়ারির এ রায় চ্যালেঞ্জ করবেন এবং সেই সূত্র ধরে গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করবেন। এমনটি আগেও ঘটেছে। হাইকোর্ট বিভাগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা বহাল রেখেছিলেন, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগকে ব্যবহার করে পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে দেয়া হয়েছিল। আর আপিল বিভাগের সেই বিতর্কিত রায়ের পথ ধরে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছর কোনো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছিল।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



