জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ : শঙ্কা ও বাস্তবতা

গত কয়েক দিনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মকাণ্ড থেকে মনে হচ্ছে যে, তারা দুটি পথের একটি বেছে নিতে পারে। প্রথমত, তারা জুলাই সনদকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এই অজুহাতে যে, এর অনেক সুপারিশ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। তাই এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এটি হবে জুলাই সনদের চূড়ান্ত সমাপ্তি। দ্বিতীয়ত, তারা তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ বেছে নিতে পারে

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লিখেছিলাম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার মিত্রদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিভাবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন বিলম্বিত করতে পারে। আমাদের পর্যবেক্ষণে এটিও উঠে এসেছিল যে, কোনো একটি দলের নিরঙ্কুশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা জুলাই সনদের সংস্কারগুলো দীর্ঘসূত্রতায় ফেলতে পারে। অথবা এর গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে; বিশেষ করে যেখানে জুলাই সনদে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। কোনো সরকারই আইনত তার হাতে থাকা ক্ষমতা সহজে ছেড়ে দিতে চায় না। তবে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত পরিবর্তন হবে, কিংবা ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যে বিএনপি জুলাই সনদ থেকে পিছিয়ে যাবে, সেটি ছিল আমাদের প্রত্যাশার বাইরে।

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নবনির্বাচিত সদস্যরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। যদিও তাদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবেও শপথ নেয়ার কথা ছিল, কিন্তু তারা তা করতে অস্বীকৃতি জানান। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। জুলাই সনদে যে সাংবিধানিক সংস্কারের কথা ভাবা হয়েছিল, তা মূলত এই সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। সংসদ সদস্যদের এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এ সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করায় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদের গণভোটের বৈধতা নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রশ্ন উপস্থাপন করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সন্দেহজনক। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বিএনপি জুলাই সনদ কিংবা এই গণভোটের ঐতিহাসিক রায়ের কোনোটিকে পাত্তা দেয়া বা এর অধীনে পরিচালিত হওয়ার কোনো অভিপ্রায় পোষণ করছে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রকৃত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে প্রকাশ্যে তার সমর্থকদের জুলাই সনদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাহলে এখন কেন তার দল এই গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে? জুলাই সনদে প্রস্তাবিত অনেক সাংবিধানিক পরিবর্তন সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েও বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ, ১৯৮৯ সালে অষ্টম সংশোধনী মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন যে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েও পরিবর্তন করা যাবে না। একটি একক হাইকোর্ট বিভাগ এবং এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভাকে এই মৌলিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়। এ আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে হাইকোর্ট বিভাগকে বিকেন্দ্রীকরণের একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভগুলো কোনো অবস্থাতে পরিবর্তন করা যায় না। তবে বাস্তবতা হলো, হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের উদ্যোগ, বর্তমান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে আপাত সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে এগুলো অপরিহার্য। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান দাবি; যা জুলাই সনদে প্রতিফলিত হয়েছে। এমনকি বিএনপিও এ পরিবর্তনগুলোতে একমত হয়েছিল যা জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ৬৮ শতাংশ মানুষের সমর্থনে এ পরিবর্তনগুলো অনুমোদিতও হয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রণয়নের সময় অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে পূর্ণ অবগত ছিল যে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এ সনদে বর্ণিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের ক্ষমতার ওপর ‘মৌলিক কাঠামো’ মতবাদ যে সীমাবদ্ধতাগুলো আরোপ করে, সে সম্পর্কে সরকার সচেতন ছিল। এ কারণে সংবিধান সংশোধনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিষয়টি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের পরিবর্তে একটি আদেশের {জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫} মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়, যাতে এটি প্রতিফলিত হয় যে, উক্ত আদেশটি ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ বা মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষমতার স্বকীয় প্রয়োগ। কারণ, কেবল এ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব। এই সংবিধান সংস্কার পরিষদ জনগণের ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ বা মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করবে, যা একটি বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে বিপ্লবের চেতনা ও আদর্শের আলোকে সংবিধান পুনর্গঠনে জনগণ ব্যবহার করে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের মাধ্যমে এ ক্ষমতা পরিষদের সদস্যদের হাতে তুলে দেয়ার কথা ছিল। প্রকৃতপক্ষে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এটিই একমাত্র উপায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সরকার এখন তার সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা জুলাই সনদ আইনগতভাবে কার্যকর করার একমাত্র স্বীকৃত পদ্ধতিটির বিরোধিতা করছে।

নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপির সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ জুলাই সনদের সপক্ষে অনুষ্ঠিত গণভোটের আইনি বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট দাখিল করেন। মামলাটি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শুনানি বা যুক্তি-তর্ক হয়নি। সেই সাথে এটি যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অনুরোধে দায়ের করা হয়েছে, সে বিষয়েও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ আইনি চ্যালেঞ্জ গণভোটের বৈধতাকে বিতর্কিত করে তুলবে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার রসদ জোগাবে। মামলাটি দায়ের করার সময়কাল নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, হাইকোর্ট বিভাগ এ চ্যালেঞ্জের বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া দেখান।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাধাগ্রস্ত করতে আওয়ামী লীগের সেই পুরনো দোসররা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাদের এ বিরোধিতার সুর এখন ক্রমশ তীব্র ও স্পর্ধিত হয়ে উঠছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে’ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জনৈক আইন বিশেষজ্ঞ অভিমত ব্যক্ত করেছেন, ‘যারা সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন, আমাদের সংবিধান সম্পর্কে সম্ভবত তাদের সঠিক ধারণা নেই।’ যারা জুলাই বিপ্লব এবং বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জনে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এমন যুক্তিই প্রত্যাশিত। তবে ওই আইন বিশেষজ্ঞ এই ধ্রুব সত্যটি এড়িয়ে গেছেন যে, জুলাই বিপ্লব জনগণের ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ বা মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের পথ পুনরায় প্রশস্ত করেছে, যা আধুনিক সাংবিধানিক আইনশাস্ত্রের পণ্ডিতদের দ্বারা সর্বজনগৃহীত। ওই ভাষ্যকার মূলত এ ধারণার ওপর নির্ভর করছেন যে, একবার সংবিধান গৃহীত হয়ে গেলে এর মৌলিক কাঠামো আর পরিবর্তন করা যায় না। এ দৃষ্টিভঙ্গিটি মূলত সত্তরের দশকের শুরুর দিকে ভারতীয় বিচারক ও পণ্ডিতদের তৈরি করা আইনি তত্ত্ব থেকে এসেছে। অথচ সমসাময়িক আধুনিক আইনশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ এ অবস্থানকে আর সমর্থন করেন না। জার্মান ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্টের প্রাক্তন বিচারক এবং বরেণ্য সাংবিধানিক আইনজ্ঞ আর্নস্ট-উলফগ্যাং বোয়কেন ফোর্ডের মতে, একটি সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরবর্তী সময়েও জনগণের ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ বা মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার অবারিত থাকে। একইভাবে, হেক্টর লোপেজ বোফিলের ন্যায় সাংবিধানিক আইনবিদগণ ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ বা মৌলিক সাংবিধানিক ক্ষমতাকে একটি নিরবচ্ছিন্ন পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন; যা শুধু প্রাথমিক সংবিধান রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ জোয়েল কোলন রিওস অভিমত ব্যক্ত করেন, যখন কোনো দেশ সাংবিধানিক সংস্কারের উত্তাল গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যায়, তখনই জনগণের এ সার্বভৌম ‘সংবিধান তৈরির ক্ষমতা’র বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যার প্রধান চালিকাশক্তি হলো গণজাগরণ। জুলাই বিপ্লবের পর ঠিক এটাই ঘটেছে। জনগণ রাজপথে নেমে তাদের সেই অমোঘ ‘সংবিধান তৈরির ক্ষমতা’র অধিকার আদায় করে নিয়েছিল বলেই সংবিধানের গণ্ডি ভেঙে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়েছিল। এই বৈপ্লবিক ক্ষমতা চর্চা না হলে— না হতো এই সরকার, আর না আসত বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার এই সুযোগ। কিন্তু টিবিএসের সেই আলোচক এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন।

গত কয়েক দিনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মকাণ্ড থেকে মনে হচ্ছে যে, তারা দুটি পথের একটি বেছে নিতে পারে। প্রথমত, তারা জুলাই সনদকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এই অজুহাতে যে, এর অনেক সুপারিশ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। তাই এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এটি হবে জুলাই সনদের চূড়ান্ত সমাপ্তি। দ্বিতীয়ত, তারা তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ বেছে নিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে, জুলাই সনদের অনেক সংশোধনী বাস্তবায়িত হলেও তা হাইকোর্ট বিভাগে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, কারণ সেগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন করবে। সারসংক্ষেপ হলো, যে পন্থাই অবলম্বন করা হোক না কেন, জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি