দেশে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বাস্তবতায় জামায়াত

মোহাম্মদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। যে সরকারকে একসময় অচল ও অটল মনে করা হতো, জনগণের জবাবদিহির দাবিতে সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই আন্দোলন আবারো প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশীরা যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, তখন তারা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই পুনর্লিখন করে।

আজ দেশ যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, জনআস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরির চেষ্টা করছে, তখন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি হলো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যাকে আর উপেক্ষা করার উপায় নেই।

যদিও দলটির অতীত ইতিহাস এখনো বিতর্কিত, তবু সংগঠন হিসেবে তারা নিজেদেরকে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

৪১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা : ২০২৪ সালের অক্টোবরে জামায়াত একটি উচ্চাভিলাষী ৪১ দফা সংস্কার রূপরেখা প্রকাশ করে। এতে শাসনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন তদারকি, পুলিশ সংস্কার, সরকারি চাকরি, সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্রনীতি- সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল; স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং আদালতে মামলার নিষ্পত্তিতে বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ। দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ে হতাশ তরুণ প্রজন্মের কাছে এসব প্রস্তাব যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

ক্যাম্পাসে অপ্রত্যাশিত সাফল্য : সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমক এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চারটি বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। এই সাফল্য জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে এবং জাতীয় রাজনীতিতেও আলোড়ন তুলেছে। বহু মানুষ যাদের চোখে জামায়াত ছিল অতীতের একটি রাজনৈতিক অবশেষ, তাদের কাছে এই জয় নতুন বাস্তবতার বার্তা দিয়েছে।

শিবির এবার আগের মতো কঠোর দলীয় কাঠামোর বদলে সমঝোতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল কৌশল গ্রহণ করেছে, যা দীর্ঘ দিনের ছাত্ররাজনীতির বিভাজনমূলক সংস্কৃতির বিপরীত। এর ফলে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের প্রভাব ঐতিহ্যগত সমর্থকের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত হচ্ছে।

প্রথম হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন : আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে জামায়াত প্রথমবারের মতো হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দলটির রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বার্তা দিচ্ছে এবং দীর্ঘ দিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে যে, জামায়াত শুধু একটি সঙ্কীর্ণ আদর্শিক কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ। সমালোচকরাও স্বীকার করছেন, এই সিদ্ধান্ত জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

গণতান্ত্রিক প্রাসঙ্গিকতার পরীক্ষা : আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনীতিতে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। জামায়াত এখন আত্মবিশ্বাসের সাথে সংস্কার ও জাতীয় ঐক্যের ভাষা ব্যবহার করছে, যা এক বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল। সমর্থকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০১-০৬ সালের জোট সরকারের সময় জামায়াতের দুই মন্ত্রী প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে এই অতীত সাফল্য বর্তমান ভোটারদের আস্থা অর্জনে যথেষ্ট হবে কি না, সেটি এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ।

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন-১৯৭১ : জামায়াতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো ১৯৭১ সালের ভ‚মিকা। সম্প্রতি দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যা জামায়াতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এই পদক্ষেপ অতীতের দায় স্বীকারের ইঙ্গিত দেয়। এই ক্ষমা জনগণ গ্রহণ করবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে প্রতীকীভাবে এটি জাতীয় পুনর্মিলনের একটি দরজা খুলে দিয়েছে।

বিএনপির হাতছাড়া সুযোগ : আওয়ামী লীগের পতনের পর ধারণা করা হয়েছিল- বিএনপি সহজেই ক্ষমতায় ফিরবে; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। জামায়াত এই সময় নিজেদের সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও লক্ষ্যনির্ভর শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা এবং আহতদের পাশে দাঁড়ানো তাদের ভাবমর্যাদা শক্ত করেছে। অন্য দিকে বিএনপির অসংগঠিত আচরণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি করে।

পুরনো দ্বৈত রাজনীতির অবসান : বাংলাদেশ এখন আর আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ভোটাররা এখন দলকে বিচার করছেন আচরণ, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে। এই নতুন বাস্তবতায় জামায়াত তুলনামূলকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কৌশলগতভাবে স্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে।

পরিবর্তনশীল জনমত : সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির সমর্থন ৩০-৩৩ শতাংশ (নাজুক লিড); জামায়াতের সমর্থন ২৬-২৯ শতাংশ (ঐতিহাসিক উত্থান)- এক বছর আগেও যা কল্পনাতীত ছিল। এই উত্থান মূলত ক্ষমতাশূন্যতার ভেতরে বিকল্প খোঁজার প্রতিফলন।

শেষ কথা : ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙে দিয়েছে। ভোটাররা এখন স্লোগানের চেয়ে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। জামায়াতের পুনরুত্থান স্থায়ী হবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

লেখক : কলামিস্ট, আইনজ্ঞ (‘দ্য উইক’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখাটি

ইংরেজি থেকে অনূদিত)