জীবনের কথা

মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে জনমানুষের মুক্তির স্বপ্নজাগানিয়া আপসহীন নেত্রী। তার শহীদ স্বামীর প্রদর্শিত পথে তিনি অবিশ্বাস্যভাবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ইতিহাসের পাতায় তার সংগ্রামী জীবনের ভাষ্য স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করলেন। সন্তান, সংসার, স্বাচ্ছন্দ্য– কোনো কিছুই তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি, বিচ্যুত করতে পারেনি। আজীবন সংগ্রাম করেছেন জনগণের অধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য, যা তাকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিভূ হিসেবে পরিচিতি দেয়।

অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম
অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনজন ভিন্ন মাত্রার, ভিন্ন বয়সের, ভিন্ন সামাজিক বৃত্তের অধিবাসী হয়েও এক জায়গায় এসে তিনজনই সময়কে অতিক্রম করেছেন, বয়সকে অতিক্রম করেছেন। অতিক্রম করেছেন তাদের সামাজিক মর্যাদা ও পরিচয়কে। লীন হয়ে গেছেন জাতিসত্তার গভীর স্পন্দনে।

একজন সেক্টর কমান্ডার পরবর্তীতে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান, একজন নিরীহ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী; অন্যজন হঠাৎ ধূমকেতুর মতো জ্বলে ওঠা এক দীপ্ত তরুণ, বৈষম্য, বঞ্চনা আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে ইনসাফের মশাল হাতে এক অদম্য লড়াকু সৈনিক। ভিন্ন স্ট্যাটাসের ভিন্ন চরিত্র হওয়া সত্ত্বে¡ও তিনজনই এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে ছুঁয়েছেন। তাদের ভাষাকে মূর্ত করেছেন নিজের উচ্চারণে, তাদের চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাক্সক্ষার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে মেলে ধরেছেন, ভালো বেসেছেন এ দেশের মাটি ও মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে। এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে তিনজনই ছিলেন জাতির মুখপাত্র। তাদের কথায় আচার-আচরণে কর্মপরিকল্পনা ও কর্মদক্ষতায় জাতি তার নিজ সত্তার স্ফুরণ প্রত্যক্ষ করেছিল, দেখেছিল মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম গর্বিত এক জাতির প্রতিচ্ছবি।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমন এক সময় দেশের নেতৃত্ব দেন, যখন স্বাধীনতার মাত্র ক’বছর পেরিয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পদধ্বনি সবেমাত্র পা ফেলেছে জাতীয় স্বকীয়তার আঙিনায়। জাতীয় স্বাতন্ত্র্য, পৃথক সত্তাবোধের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মোড়কে স্বাধীন সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও ঐতিহ্যকে পথভ্রষ্ট করার অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি এর ভবিষ্যৎ পরিণতি উপলব্ধি করেছিলেন সঠিকভাবে। এর মোকাবেলায় তিনি মুসলিম জাতিসত্তা ও বাংলাদেশী সংস্কৃতি সহযোগে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা উপস্থাপন করলেন। স্বতন্ত্র জাতিসত্তার পরিচয়কে তুলে ধরলেন। পরিচিত করলেন বহির্বিশ্বে। জাতি ফিরে পেলো স্বতন্ত্র নিজস্ব পরিচয়। তার প্রদর্শিত পথে বাংলাদেশ খুঁজে পেয়েছিল দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় লড়াইয়ের উপকরণ।

মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে জনমানুষের মুক্তির স্বপ্নজাগানিয়া আপসহীন নেত্রী। তার শহীদ স্বামীর প্রদর্শিত পথে তিনি অবিশ্বাস্যভাবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ইতিহাসের পাতায় তার সংগ্রামী জীবনের ভাষ্য স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করলেন। সন্তান, সংসার, স্বাচ্ছন্দ্য– কোনো কিছুই তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি, বিচ্যুত করতে পারেনি। আজীবন সংগ্রাম করেছেন জনগণের অধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য, যা তাকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিভূ হিসেবে পরিচিতি দেয়। দেশ ও জাতির কল্যাণের কথা ভেবে, নিজ আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার কারণেই তিনি দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন– ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আর আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।’

রাজনৈতিক ফ্যাসিজমের মূল ভিত্তি হলো কালচারাল ফ্যাসিজম। যা প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে গত ১৬ বছরে অপ্রতিহভাবে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আধিপত্যবাদের মোড়কে জাতিসত্তা ও স্বাধীনতার চেতনাকে প্রায় নিঃশেষ করে দেয়া হয়েছিল। দুর্নীতি এবং পক্ষপাতিত্বের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল জাতির প্রত্যাশা। এর বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি তাদেরই একজন। অবিচার, বঞ্চনা আর শোষণের বিরুদ্ধে এক আপসহীন লড়াকু। সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার এক নিরন্তর সৈনিক। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই তাকে গণমানুষের চেতনা ও স্বপ্নের বাহকে পরিণত করে। কালচারাল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে তার বজ্রকঠিন অবস্থান তাকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীকে পরিণত করে। একই আদর্শের ধারক ও পতাকাবাহী হিসেবে উল্লিখিত তিনজনই দেশের, জনগণের, জাতির একক সত্তায় পরিণত হন। তিনজনই তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের মৃত্যু পুরো জাতিকে ধর্ম, দল-মত নির্বিশেষে এক ছাদের নিচে এনে দাঁড় করিয়েছে। এর কারণ একটিই– স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আপসহীন মনোভাব এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন দৃঢ় অঙ্গীকার। তাদের স্বপ্নের পথে চলার, দেশকে পরিচালনার দায়িত্ব এখন জাতীয় নেতাদের। এ ক্ষেত্রে জাতির প্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার প্রতিটি রাজনৈতিক দলের চিন্তা-চেতনা ও অঙ্গীকারে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। এতে তাদের রূহ খানিকটা হলেও স্বস্তি পাবে নিঃসন্দেহে। একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের মানুষের মানসপট বুঝতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
[email protected]