ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের যে আন্দোলনের সময় জাতীয় নেতারা, বিশেষ করে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি মহাসচিব বারবার বলেছিলেন, সরকারের পতন ঘটলে সাধারণ নির্বাচনের পর দেশে অন্তত দুই বছরের জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠিত হবে। বিভিন্ন দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এ সরকার দুই বছরে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবেন এবং এরপর একটি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবেন। নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে যারা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবেন এবং মেয়াদ শেষে সাধারণ নির্বাচন দেবেন। নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এভাবেই দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা হবে। জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্রের যাত্রাপথ সমৃদ্ধতর করবে; নিঃসঙ্কোচে, নির্ভয়ে ভোট দেবে।
জাতীয় নেতাদের এই ঘোষণা দেশবাসীকে আশান্বিত করেছিল যে, জাল ভোট, ডামি ভোট, রাতের ভোটের আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। গণতন্ত্রের মঞ্চে নতুন অভিষেক ঘটবে বাংলাদেশের।
এটি ছিল একটি স্বপ্নের মূর্ছনা। ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-গণবিপ্লবের পরপরই বদলে গেল এই ন্যারেটিভ। বদলে গেল নেতাদের বাচনিক প্রকাশ। সেখানে জায়গা করে নিলো শারীরিক ভাষা। সব শালীনতা, কৌলীন্যের জায়গা দখল করে নিলো ভাষার কদর্য ব্যবহার। এ পরিবর্তন শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র আকাক্সক্ষায়। রাজনীতির এ খিস্তি খেউড়ে হারিয়ে গেছে গণতন্ত্রের স্বপ্ন, জনগণের অধিকারের প্রশ্ন, দেশ গড়ার স্বপ্ন।
আমাদের অজস্র সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ভ‚-রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশ ঘিরে পরাশক্তিগুলোর নানামুখী নীলনকশা নিয়ে তৈরি হচ্ছে একের পর এক সমস্যা। এ বিষয়ে নেতাদের কোনো কর্মপরিকল্পনার কথা শোনা যায় না। তারা কথা বলছেন না প্রায় ছয় কোটি মানুষ, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে আসার বিষয়ে। জনগোষ্ঠীর ৪২ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এখনো পঞ্চম শ্রেণীর নিচে। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এ নিয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা কেউ উপস্থাপন করছেন না। আদানির প্যাঁচে বিদ্যুৎ পাওয়ায় অনিশ্চয়তা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা, এসব নিয়ে কোনো নেতার মুখে কথা নেই। স্বাস্থ্যসেবার দুর্দশা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি; যার মূর্তিমান প্রকাশ শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে সবার নাকের ডগায় হন্তারকের উধাও হয়ে যাওয়া, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ‘সন্ত্রাসীকে’ খুঁজে বের করার দাবিদার ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি, পুলিশ, সিআইডি কেউ এখন খুনিকে খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ এদেরকে নিয়েই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেয়ার দাবি করছেন। লুট হওয়া অজস্র অস্ত্র উদ্ধারের ব্যর্থতা সামনের দিনগুলোকে আরো অস্থির করে তুলতে পারে। পরাজিত শক্তির চাঁইরা এখনো বহাল তবিয়তে আমলাতন্ত্রে জেঁকে বসে আছে। তাদের বিচারের বা অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই; এ ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতারা কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পেশ করছেন না।
পরিবেশ বিপর্যয়ের অভিঘাত, আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি আজো আমাদেরকে স্থবির করে রেখেছে, পাহাড়সম বেকার সমস্যা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির কষাঘাতে জাতীয় অর্থনীতির মুখ থুবড়ে পড়া, পাচার হওয়া লাখো হাজার কোটি টাকার নায়কদের বিচারে সোপর্দ করার কথা হারিয়ে গেছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির জোয়ারে। পক্ষান্তরে নেতারা পুরনো ন্যারেটিভের কাসুন্দি ঘাঁটার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা বুঝতে পারছেন না, জেন-জি’র চেতনা ও স্বপ্নের আলেখ্য; বুঝতে পারছেন না বস্তাপচা পুরনো কাসুন্দির কোনো আবেদন বর্তমান প্রজন্মের কাছে নেই। নবীনরা স্বপ্ন দেখে মর্যাদার সাথে বাঁচার; কারো অনুগৃহ নিয়ে নয়। তারা চায় জীবনের নিরাপত্তা, পড়াশোনা শেষে জীবিকার নিশ্চয়তা। তাদের চোখে মুখে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। পেছন ফিরে তাকানোর সময় তাদের নেই। এ ব্যাপারে নেতারা নিশ্চুপ। অথচ এই জেন-জিই এবারের নির্বাচনের মূল পরিমাপক। এরা পৃথিবীকে চেনে; বাংলাদেশের মাটিতে পুষ্ট এদের চিন্তা-চেতনা। সবচেয়ে বেশি চেনে এ দেশের আপসকামী নেতাদেরকে, যারা ক্ষমতায় স্বাদ পাওয়ার জন্য তখনো বিভেদের দেয়াল তোলেন যখন প্রয়োজন ইস্পাত কঠিন ঐক্যের।
বাংলাদেশ এখন এক কঠিনতম যুগসন্ধিক্ষণে। এখন দরকার ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য। ঐক্য প্রয়াস বিঘ্নিত করতে পারে এ ধরনের কোনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জাতি আশা করে না। জাতির প্রত্যাশা এবং স্বপ্ন এখন একটি শক্তিশালী জাতীয় সরকার। এই আঙ্গিকে এগোবার কর্মকৌশল নিয়ে নেতাদের ভাবতে হবে। চব্বিশের বিপ্লবের মৌলিক স্বপ্ন, তার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব এখন আরো কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি করেছে জাতিকে, চরম পরীক্ষায় ফেলেছে জাতীয় নেতাদেরকে। এখনকার সময়োচিত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে এ দেশের আগামী। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে পথ চলবে, নাকি করদরাজ্যের মর্যাদাহীন গোলামির জিঞ্জিরে নিজেকে সমর্পণ করবে। এই কঠিন পরীক্ষায় নেতাদের দিকে তাকিয়ে গোটা জাতি। নেতাদের মধ্যে এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যের সুর বাঙময় হয়ে উঠবে কি? নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে জাতির আকাক্সক্ষার সাথে জাতীয় নেতারা আবারো একাত্ম হয়ে সব ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারবেন কি?
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



