জাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা কেন গুরুত্বপূর্ণ

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সরকারপ্রধান জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন ও মানবকল্যাণের যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন তথা জাকাত, সাদাকা, ওয়াক্ফ ও কর্জে হাসানা এখন আর শুধু ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে নেই। জাতিসঙ্ঘ এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন থেকে তহবিল সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব একজন উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন এই কাজের জন্য। সুতরাং ইসলামিক ফাইন্যান্স এবং ইসলামিক সোস্যাল ফাইন্যান্স এখন একটি চিরন্তন ও বৈশ্বিক বাস্তবতা। বাংলাদেশেও এর পরিধি ও জনপ্রিয়তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক ডজনের বেশি ইসলামী ব্যাংকে কোটি কোটি মানুষ গ্রাহকসেবা নিচ্ছে

গত শনিবার (৭ মার্চ) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশের সম্মানিত আলেম-ওলামা, মাশায়েখ ও এতিমদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে জাকাত দেয়া হলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশে দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ইসলামের বিধান অনুযায়ী সমাজের অনেক বিত্তবান ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে জাকাত দেন। আবার কেউ কেউ সরকারের জাকাত বোর্ডের মাধ্যমেও জাকাত পরিশোধ করেন। তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে— প্রতি বছর বাংলাদেশে এই জাকাতের পরিমাণ ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে। কেউ কেউ এর পরিমাণ আরো অনেক বেশি বলেছেন। তবে তিনি মনে করেন, এই বিপুল অর্থ থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ জাকাত বণ্টনে এখনো সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত পদ্ধতির ঘাটতি রয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিতভাবে জাকাত বণ্টন না করায় বিত্তবান ব্যক্তির জাকাত আদায় হয়ে গেলেও জাকাতের অর্থ দারিদ্র্যবিমোচনে কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে— এটি একটি বড় প্রশ্ন।

জাকাতের মূল উদ্দেশ্যের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, জাকাতদাতাকে ইসলামী বিধান এমনভাবে জাকাত বণ্টনে উৎসাহিত করে, যাতে একজন জাকাতগ্রহীতাকে প্রথম বছর জাকাত গ্রহণের পর আর জাকাত গ্রহণ করতে না হয়। তিনি মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাকাতকে দারিদ্র্যবিমোচনের একটি কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

তারেক রহমান বলেন, পরিকল্পিতভাবে বণ্টন করা গেলে দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এমন বাস্তবতায়, সরকার জাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনা করেছে। ধনী-দরিদ্র সবমিলিয়ে দেশে বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা কমবেশি চার কোটি। এসব পরিবারের মধ্য থেকে যদি দরিদ্র কিংবা হতদরিদ্র পরিবারগুলো চিহ্নিত করে প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে পাঁচ লাখ পরিবারকে এক লাখ করে টাকা জাকাত দেয়া হয়— আমার বিশ্বাস এসব পরিবারের মধ্য থেকে বেশির ভাগ পরিবারকে পরের বছর আর জাকাত দেয়ার দরকার হবে না। জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন করার লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, ইসলামিক স্কলার এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ‘জাকাত বোর্ড’ পুনর্গঠন সম্ভব। জাকাতকে দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যবহার করে ইসলামী বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলেও আমি মনে করি।

আমি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের দীর্ঘ উদ্ধৃতি তুলে ধরেছি; কারণ আমরা গত প্রায় দেড় যুগ ধরে জাকাত ব্যবস্থাপনা ও তার অ্যাডভোকেসি নিয়ে কাজ করছি, যার মূল কথাগুলো তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতা বলছে যে, বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান এই প্রথম ইসলামের একটি মৌলিক বিধান জাকাত সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই জাকাত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তার সরকারের একটি পরিকল্পনার কথা বলেছেন। আমার মনে হয়েছে তিনি শুধু বলার জন্যই বলেননি; তিনি জাকাত দিয়ে দারিদ্র্যবিমোচনের স্বপ্ন দেখছেন। তার এই সদিচ্ছা ও অভিপ্রায়কে আমি স্বাগত জানাই।

১৯৮৩ সালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারপ্রধান থাকাকালে জাকাত অর্ডিন্যান্স জারি এবং তার আওতায় একটি ‘জাকাত বোর্ড’ গঠন করেছিলেন। অবশ্য সেই আইনের আওতায় জাকাত বোর্ডে জাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়নি। কেউ স্বেচ্ছায় সেখানে জাকাত দিলে তাকে আয়করের ১০ শতাংশ রিবেট দেয়ার বিধান করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার সেই অধ্যাদেশটি কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন না করে ২০২৩ সালে ‘জাকাত আইন’ হিসেবে সংসদে পাস করে। বস্তুত ওই আইনটি অসম্পূর্ণ। এর ব্যাপক সংশোধন ও সংযোজন করার সুযোগ আছে।

আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বাংলাদেশে কোনো দিন সরকারিভাবে আইন করে বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত আদায় করা হয়নি। তবে ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের পীর ও আলেমরা স্ব-উদ্যোগে মাদরাসা, এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং বা মেহমানখানা নির্মাণ করেছেন এবং তা পরিচালনার জন্য জাকাত ও সাদাকা সংগ্রহ করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। সরকার এতিমখানাগুলোতে মাথাপিছু ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট দিয়ে থাকেন, যা অপ্রতুল। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো এ ধরনের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান জাকাত ও সাদাকা তহবিল ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বাইরে রয়ে গেছে। অনেকেরই হিসাব ঠিক মতো রাখা হয় না, নিরীক্ষা কার্যক্রম নেই এবং কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে সঠিকভাবে জবাবদিহিতা করা হয় না। জাকাত তহবিল ব্যবহার বা বণ্টনে শরিয়ার বিধিবিধান অনুসরণ নিশ্চিত করার বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া যারা ব্যক্তিগতভাবে জাকাত দেন তাও সঠিকভাবে হিসাব করে এবং মাসায়ালা অনুসরণ করে আদায় করা হয় না। এভাবে প্রতি বছর ব্যক্তিপর্যায়ে কোটি কোটি টাকা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে জাকাত দেয়া হলেও তা সমাজে কোনো ইতিবাচক ও দৃশ্যমান ফল দিতে পারছে না। সরকারিভাবে জাকাত ব্যবস্থাপনা করা হলে এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।

রাসূল সা:-এর সময় থেকেই জাকাত প্রধানত সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্পাদিত হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা উসমান রা:-এর আমলে রাষ্ট্রের সীমানা অনেক বিস্তৃত হলে অপ্রদর্শনযোগ্য মালের জাকাত (যেমন স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ মুদ্রা) ব্যক্তিগতভাবে প্রদানের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। পরবর্তীকালে মুসলিম শাসকদের নীতিনৈতিকতার অবনতি ঘটলে জাকাত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হয়। আরো পরে ঔপনিবেশিক শাসনামলে জাকাত, ওয়াক্ফের মতো ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। তবে সৌদি আরব, ইয়েমেন, লিবিয়ার মতো কিছু দেশে সবসময়ই জাকাত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আঞ্জাম দেয়ার ঐতিহ্য চালু আছে। সাম্প্রতিককালে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, সুদান, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় আইনপ্রণয়নের মাধ্যমে জাকাত ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাকাত ও ওয়াক্ফ ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। মালয়েশিয়ার কোনো কোনো রাজ্যে কয়েকশত বছর ধরে রাজার নেতৃত্বে জাকাত আদায় ও বিতরণ করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংকের সহায়তায় জাতীয় জাকাত বোর্ড কাজ করছে। সেখানে ইউএনডিপি জাকাত প্রকল্প বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, পরিকল্পিতভাবে জাকাত বণ্টন করা গেলে দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এ প্রসঙ্গে কিছু হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিত্তবান মুসলমানদের কাছ থেকে কী পরিমাণ জাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব?

২০০৮ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করা যেতে পারে। এরপর দেশে অনেক অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে এবং বহু মানুষ আরো ধনী হয়েছে। এরূপ প্রেক্ষাপটে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. কবীর হাসানের নেতৃত্বে ২০২২ সালে একটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। ওই সমীক্ষা অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব। ওই সমীক্ষায় স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এগুলো যোগ করা হলে মোট পরিমাণ আরো অনেক বাড়বে।

এর মানে দাঁড়াচ্ছে, সরকার চাইলে রাজস্ব আয়ের একটি নতুন খাত যোগ করার মাধ্যমে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে। তখন সরকারি বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণও সেভাবে বাড়ানো সম্ভব। আর এই অতিরিক্ত জাকাত-অর্থ কেবল দারিদ্র্যবিমোচন তথা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিতে ব্যয় করা যেতে পারে। চলতি অর্থবছরে সরকারি বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বাজেট বরাদ্দ ছিল এক লাখ কোটি টাকার একটু বেশি। অবশ্য এর মধ্যে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি যুক্ত আছে। এগুলো ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দারিদ্র্যবিমোচনে বরাদ্দের পরিমাণ আরো কম। সুতরাং জাকাত তহবিল দিয়ে দারিদ্র্যবিমোচনের কাজ ত্বরান্বিত করা সম্ভব। এ ছাড়া ওয়াক্ফ, সাদাকা/অনুদান ও কর্জে হাসানা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি জাকাত বোর্ডকে পুনর্গঠন করা সম্ভব। তার এ উপলব্ধিকে আমরা স্বাগত জানাতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, বিদ্যমান জাকাত আইন, ২০২৩-কে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করতে হবে। এর জন্য যেসব দেশে জাকাত আইন আছে, সেসব দেশ থেকে সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এরূপ আইনের আওতায় আয়কর আইনের মতো দৃশ্যমান আয় থেকে বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত কেটে নেয়া যেতে পারে। আর অদৃশ্যমান সম্পদের (স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ অর্থ) জাকাত ব্যক্তিগতভাবে দেয়ার বিধান করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাকাত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন বেসরকারি জাকাত ব্যবস্থাপনা সংস্থাকে শর্তাধীনে লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার মডেল পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। অবশ্যই লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি জাকাত বোর্ড রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে। লাইসেন্স প্রাপ্ত বেসরকারি জাকাত ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে দেয়া যেতে পারে, যেখান থেকে তারা জাকাত সংগ্রহ করবে। তারা যে জাকাত সংগ্রহ করবে তার একটি অংশ সরকারি জাকাত বোর্ডে জমা দেবে এবং আরেকটি অংশ সরকার অনুমোদিত প্রকল্পে বিতরণ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি শরিয়াহ বোর্ড সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেবে।

তৃতীয়ত, জাকাত আইনে এরূপ বিধান থাকতে পারে যে, যারা সরকার অনুমোদিত সংস্থায় জাকাত দেবেন, তাদেরকে সমপরিমাণ আয়কর অব্যাহতি দেয়া হবে। চতুর্থত, অনেকেরই ‘বিজনেস জাকাত’ সম্পর্কে ধারণার অভাব আছে। কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছায় ব্যালান্সশিটে জাকাত ক্যালকুলেশনের বিষয় সংযুক্ত করতে পারে। উল্লেখ্য যে, দেশে এখন বেশ কিছুসংখ্যক বাহরাইন-ভিত্তিক Accounting & Auditing Organization of Islamic Financial Institutions (AAOIFI)-এর সার্র্টিফাইড শরিয়াহ অডিটর পাওয়া যাচ্ছে, যারা বিভিন্ন কোম্পানির বিজনেস জাকাত নিরূপণ করার জন্য পরামর্শক সেবা দিতে পারে। ইদানীং কিছু কিছু কোম্পানি এরূপ সেবা নিচ্ছেও। জাকাত ব্যবস্থাúনাকে কার্যকর করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। আলেম ও ইসলামিক স্কলার ছাড়াও ফাইন্যান্স ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। World Zakat & Waqf Forum (WZWF) নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা জাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করেছে, যার সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।

ইতোমধ্যে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম) নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিগত দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশে জাকাত ব্যবস্থাপনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে দেশের বহু জ্ঞানী-গুণী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি জড়িত আছেন। সংস্থাটি জাকাত তহবিল ব্যবহার করে দারিদ্র্যবিমোচনের কার্যকর মডেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা এর কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশংসা করেছেন। সুতরাং দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাতভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে সিজেডএম-এর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, এ সংস্থার পক্ষ থেকে বিগত কয়েকজন অর্থমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে জাকাত ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক ও সরকারিভাবে করার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। তারা এই উদ্যোগের প্রশংসা করলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেননি। মূলত জাকাতের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিতে হলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও বাজেট ডকুমেন্টে তার উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। সরকারের দারিদ্র্যবিমোচন পরিকল্পনায়ও তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সরকারপ্রধান জাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন ও মানবকল্যাণের যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন তথা জাকাত, সাদাকা, ওয়াক্ফ ও কর্জে হাসানা এখন আর শুধু ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে নেই। জাতিসঙ্ঘ এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন থেকে তহবিল সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব একজন উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন এই কাজের জন্য। সুতরাং ইসলামিক ফাইন্যান্স এবং ইসলামিক সোস্যাল ফাইন্যান্স এখন একটি চিরন্তন ও বৈশ্বিক বাস্তবতা। বাংলাদেশেও এর পরিধি ও জনপ্রিয়তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক ডজনের বেশি ইসলামী ব্যাংকে কোটি কোটি মানুষ গ্রাহকসেবা নিচ্ছে।

জাকাত ব্যবস্থপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য আইনি, কাঠামোগত, লক্ষ্যভিত্তিক ও শরিয়াহসম্মত নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। এর জন্য সরকারি উদ্যোগ সুদূরপ্রসারী কল্যাণ বয়ে আনবে। আমরা আশা করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী জাকাত তহবিল ব্যবহার করে বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

লেখক : সাবেক সচিব ও সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
[email protected]