মুক্তিযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ, পিলখানায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন

মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইপিআরের ৮১৭ জন সদস্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেন। তাদের কাছে পতাকা ছিল আত্মমর্যাদার প্রতীক; জীবন উৎসর্গের শপথ। স্বাধীনতাযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এ বাহিনীর দু’জন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ ও ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, আটজন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম এবং ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

মো: শরিফুল ইসলাম
২৩০ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত উপমহাদেশের প্রাচীনতম বাহিনীর সদর দফতর ঢাকার পিলখানা। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়, দেশপ্রেম, বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর অঙ্গীকার পূরণের জীবন্ত প্রাঙ্গণ। এখানকার প্রাণবন্ত প্রকৃতি যেন ধারণ করে আছে জাতির সঙ্কটকালের স্পন্দন। সবুজ-শ্যামল বৃক্ষরাজিতে ভরপুর পিলখানার অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষের মধ্যে একটি বিশেষ বটবৃক্ষ— যার সাথে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মার্চের দুঃসাহসিক বীরত্বগাথা।

২২ মার্চ রাতে ইপিআর সদস্যদের দুঃসাহসিক বীরত্বগাথা
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও শোষণের প্রতিবাদে উত্তাল পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশ। মুক্তিকামী বাঙালি সিদ্ধান্ত নেয়, ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ নয়, পালিত হবে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে, উড়বে না আর পাকিস্তানের পতাকা; বাংলার মাটিতে ওড়ানো হবে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মুহূর্তে এ খবর পৌঁছে যায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কাছে। ১৫ মার্চ পুরো পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয় পাকিস্তান থেকে ছুটে আসা ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের সেনাসদস্যরা। ১৬ মার্চ নিরস্ত্র করা হয় পিলখানায় ইপিআরের সব বাঙালি সদস্যকে; একদিকে বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আরেক দিকে চাপা উত্তেজনা— চারদিকে বন্দুক তাক করা, থমথমে পরিস্থিতি; যেকোনো মুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে ইপিআরের একদল সাহসী বাঙালি সৈনিক নিলেন এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত, উত্তোলন করবেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মৃত্যুকে উপেক্ষা করে, গোপনে, সতর্কতায়, নীরব পরিকল্পনায় তারা এগিয়ে গেলেন। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পিলখানার সবচেয়ে উঁচু একটি গাছ। ২২ মার্চ দিবাগত রাতে, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে ইপিআরের ১০-১১ জন দেশপ্রেমিক ও সাহসী সৈনিক সেই গাছে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ মার্চ সকালে তা উড়তে থাকে দৃপ্তভাবে— শত্রুর ঘাঁটির ভেতরে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে। ওই ঘটনা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক বিদ্রোহ— বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ, যা মুহূর্তে বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ঢাকার পাশাপাশি যশোর, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, দিনাজপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই সাহসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

BGB-25-3-------3
২২ মার্চ দিবাগত রাত, ১৯৭১; পিলখানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন যারা (ডানে) ২২ মার্চ দিবাগত রাত, ১৯৭১; পিলখানায় উত্তোলিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা | সংগৃহীত

বেলুচ রেজিমেন্টের নিয়ন্ত্রিত পিলখানায় এই পতাকা উত্তোলন ছিল এক অসাধারণ দুঃসাহসিকতা— যা পাকিস্তানি শাসকদের জন্য ছিল সুস্পষ্ট বার্তা; বাঙালি জাতির স্বাধীনতার অটল সঙ্কল্পের বহিঃপ্রকাশ। ল্যান্স নায়েক বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে অসীম সাহসিকতার বীরত্বগাথা, ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ দিবাগত রাতে তৎকালীন ইপিআরের কতিপয় সাহসী ও অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পিলখানার বটবৃক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটান। বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত ‘যুদ্ধ দিনের আত্মস্মৃতি’ শীর্ষক বই সেই সময়কার ঘটনাবলির এক মূল্যবান দলিল।

বীর প্রতীক আব্দুল মালেকের সাক্ষাৎকার এবং তার বইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা অনুসন্ধানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে পিলখানায় বটবৃক্ষে পতাকা উত্তোলনের একটি সাদাকালো ছবি আবিষ্কার করা হয়। ছবির নিচে সংক্ষিপ্ত তথ্য— ১৯৭১ সালের মার্চে পিলখানার এক গাছে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। তথ্যটি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যে বিপুল। পরাধীন দেশে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের এই ঘটনা শুধু প্রতীকী সাহসিকতা নয়; এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ— মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ এবং স্বাধীনতার প্রত্যয়ে এক সুদৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ।

২৫ মার্চের কালরাত ও মহান মুক্তিযুদ্ধ : ২২ মার্চ দিবাগত রাতের সেই সাহসিকতার পর আসে ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত। অপারেশন সার্চলাইটের নামে পিলখানায় চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত ইপিআর সদস্যদের ওপর নেমে আসে নৃশংসতা। সুবেদার মেজর শওকত আলী, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই, নায়েব সুবেদার শামসুল হক ও হাবিলদার খোরশেদ আলমসহ অনেককে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে। তাদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। তবু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— নির্যাতন তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। শেষে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের পাগলায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে; সেখানে ব্রাশ ফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাদের। সেদিন রাতে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেন তৎকালীন ইপিআরের সিপাহি আব্দুল মালেকসহ পতাকা উত্তোলনকারী বেশ কয়েকজন সদস্য।

শুধু আব্দুল হাই, আব্দুল মালেকরা নন, তৎকালীন ইপিআরের ১২ হাজার অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজনকে রেখে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইপিআরের ৮১৭ জন সদস্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেন। তাদের কাছে পতাকা ছিল আত্মমর্যাদার প্রতীক; জীবন উৎসর্গের শপথ। স্বাধীনতাযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এ বাহিনীর দু’জন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ ও ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, আটজন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম এবং ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার : বিজিবি দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস, ১৯৭১ সালের মার্চের পতাকা উত্তোলনের পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণভিত্তিক বিবরণ তথ্যচিত্র আকারে উপস্থাপিত হলে আবেগাপ্লুত হন বিজিবির সদস্যরা। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়া হয় সেই গৌরবগাথা— যেন তারা জানেন, সীমান্ত রক্ষার বর্তমান দায়িত্বের পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগের গভীর ঐতিহ্য। আজও সেই বটবৃক্ষ (পাকুড়গাছ) নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। তার ছায়ায় ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। সে সাক্ষ্য দেয়— কিছু সাহসী মানুষ জীবন বাজি রেখে যে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, তা কেবল একটি প্রতীক নয়; এটি স্বাধীনতার অঙ্গীকার, আত্মমর্যাদার ঘোষণা ও সীমান্ত রক্ষার অমোঘ প্রেরণা।

পরিশেষে বলতে চাই, জাতীয় পতাকা— আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ অতীতে যেমন দায়িত্ব পালন করেছে, আজও তেমনি সতর্ক ও অঙ্গীকারবদ্ধ। ভবিষ্যতেও থাকবে— জাতির পতাকা সমুন্নত রাখার দৃপ্ত প্রত্যয়ে, ইতিহাসের গৌরব বুকে ধারণ করে।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, সদর দফতর, বিজিবি