পুরোদমে নির্বাচনী প্রস্তুতির মাঝেও নানা খটকা, প্রশ্ন, ক্যাচাল। বাদ যাচ্ছে না নির্বাচন ঠেকিয়ে দেয়া বা বানচালের কথাও। যার রেশ টেনে কড়া হুমকি দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। বলেছেন, কেউ নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কী রকম প্রস্তুতি কমিশন নিচ্ছে, সে সম্পর্কে জানানো হচ্ছে প্রতিদিন। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পুলিশ ও প্রশাসনে বদলি করা হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় লটারি করে ৬৪ জেলায় এসপি চূড়ান্ত করে তাদের বদলি ও পদায়ন করা হয়। এর মধ্যে ৫০ জন বর্তমান এসপিকে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বদলি করা হয়েছে। আর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা ১৪ পুলিশ কর্মকর্তাকে জেলার এসপি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী পুলিশ কমিশনার পদে নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একদিন বাদে পুলিশের ৩৩ কর্মকর্তাকে উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদে পদোন্নতিও দেয়া হয়েছে। এর আগে একাধিক প্রজ্ঞাপনে ৫০ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেয় সরকার। পাশাপাশি ইউএনও পর্যায়েও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১৬৬ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তি-সামর্থ্যরে জানান দিচ্ছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না নির্বাচনে ডিসি, এসপি ও ইউএনওদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ডিসিরা রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ইউএনওদের অনেকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও এবার এখনো রিটার্নিং কর্মকর্তা কারা হবেন, সে সিদ্ধান্ত জানায়নি ইসি। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নে গণভোটের অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এটি নির্বাচনের সঙ্গে বেশ প্রাসঙ্গিক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে একই দিনে আয়োজন করা হবে গণভোট। গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের অভিপ্রায় নেয়া হবে। অধ্যাদেশে বলা হয়, চব্বিশের ছাত্র-জনতার সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে গণভোটে উপস্থাপন করতে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন ও জারি করেছে।
গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে। গণভোটে চারটি প্রস্তাবের ওপর একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে ভোটারদের। প্রশ্নটি হবে, আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন? ক. নির্বাচনকালীন তত্ত¡াবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
জুলাই সনদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান বিতরণের দায়িত্ব সরকারের দিক থেকে ঠিকভাবে করা হয়েছে কি না তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। ‘গণভোটের’ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিষয়ে সমাজের সব শ্রেণী মানুষের মধ্যে যথাযথভাবে শেয়ার করা দরকার। যাতে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় ‘আইন তৈরি’ করার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা না থাকে। গণভোটের ফলাফলের ওপর ঠিক হবে আগামী রাজনীতির পথরেখা।
অনেক কাঠখড় পোড়ানো হয়েছে, অনেক সময় ও শক্তি ব্যয় হয়েছে জুলাই সনদের পেছনে। যেসব বিষয়ে বিএনপি অসম্মতি বা ভিন্নমত দিয়ে রেখেছে, সেগুলোর কী হবে? প্রশ্ন আরো আছে। দেশজুড়ে এসব নিয়ে আলোচনার পারদ চড়ছে। কথার খই ফুটছে রাস্তাঘাটের আলোচনায়। এখানে শ্রীলঙ্কা-নেপালের প্রেক্ষাপট বেশ প্রাসঙ্গিক। দেশ দু’টিতেও প্রায় এ মাপে ক্ষমতার পট বদলেছে। কিন্তু, পরবর্তী দৃশ্যপট এমন হয়নি। কাদা ছোড়াছুড়ি এ পর্যায়ে যায়নি। তারা রাজনীতিকে জনমুখী করতে পেরেছে। বাংলাদেশ পারেনি।
এখানে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব দৃশ্যমান। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির চর্চা দলীয় মনোনয়নপ্রক্রিয়া থেকে। যেকোনো বড় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেতে একজন প্রার্থীকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। সৎ, যোগ্য; কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল প্রার্থীদের জন্য এটি রাজনীতিতে লাল সঙ্কেত। শুধু নমিনেশন নয়, প্রার্থীদের বিপুল অর্থ ব্যয় এখন জয়ের অন্যতম শর্তে পরিণত হয়েছে। এ বিপুল অর্থের উৎস, তা বৈধ না অবৈধ- এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের জানার গরজ খুব একটা যে নেই, তা আমাদের সমাজ-বাস্তবতায় স্পষ্ট। নির্বাচনের খরচ জোগানো ধনী অর্থদাতা বা পৃষ্ঠপোষকরা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে এক ধরনের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবে দেখবেন- এটাই স্বাভাবিক। ঘটনা এবং ইতিহাস বলছে, অর্থ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার যত সুযোগ পেয়েছে, তা তত দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতাকে আমন্ত্রণ করেছে। এ পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুতর পরিণতির শিকার হয় দেশের শাসনব্যবস্থা।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী। সরকারি বা বিরোধী দল-নির্বিশেষে সংসদ সদস্যপদ মূলত ধনিক শ্রেণীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশের মাত্র ০.০৭ শতাংশ মানুষের কাছে এক কোটি টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। বাস্তবে সংসদ সদস্যদের বিশাল অংশ এ ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ফলে তারা বাকি ৯৯.৯৩ শতাংশ সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব বা তাদের দুঃখ-কষ্ট কতটা বোঝার চেষ্টা করবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুযোগে অনেক রাজনীতিবিদ গুরুতর অপরাধমূলক অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও ক্ষমতায় টিকে যান। নমুনা বলছে, সামনেও এর রেশ কাটছে না। তারপরও যেকোনো সচেতন ও গণতন্ত্রকামী নাগরিকের কাছে নির্বাচন প্রত্যাশিত।
তবে মূল কথা হলো, রাজনীতিবিদদের বাগি¦তণ্ডা ছেড়ে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ যেন না ভাবেন- এ সংস্কার, ভোট এবং জিত দিয়ে চিরস্থায়ী রাজা হতে পারবেন। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে সব ক্ষমতাধর রাজা-মহারাজাও একদিন সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে গেছেন। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়িতার এক গভীর রূপক, যেখানে উত্থান-পতন ঘটে এবং আবার সময়ের সাথে সাথে সবকিছু পরিবর্তিত হয়ে যায়। ক’দিন আগে আর পরে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



