মোহাম্মাদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর
সম্প্রতি বাংলাদেশে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এগুলো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অকার্যকারিতার সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। একটি ছোট্ট শিশুকন্যা যদি তার নিজের বাসা, উঠান, রাস্তা, স্কুলপথ কিংবা আশপাশের পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের উন্নয়ন, সভ্যতা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সফলতার সব দাবি এক মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
যে বয়সে একটি শিশুর খেলাধুলা করার কথা, স্কুলে যাওয়ার কথা, মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সে তাকে যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে জীবন দিতে হচ্ছে। এর চেয়ে বড় সামাজিক ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?
এসব ঘটনাকে শুধু ‘ধর্ষণ ও হত্যা মামলা’ হিসেবে দেখা ভুল। এগুলো মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। শিশুর জীবনের অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, মর্যাদার অধিকার ও ভয়মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার- সব কিছু এখানে পদদলিত, নিষ্পেষিত।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধান। আর শিশুদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরো বেশি, কারণ তারা আত্মরক্ষায় অপারগ। অপরাধীদের বিচার অবশ্যই হতে হবে; কিন্তু আমাদের আরো কঠিন প্রশ্ন করতে হবে যে, এই বিচার কত দ্রুত ও কবে কার্যকর হবে?
বর্তমান ব্যবস্থায় একটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া অতিশয় দীর্ঘ। তদন্ত, নিম্ন আদালতে বিচার শুরু, এরপর আপিল, রিভিশন, উচ্চ আদালত, কখনো মৃত্যুদণ্ড হলে ডেথ রেফারেন্স- সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এর মধ্যে জনমত শান্ত হয়ে যায়, মিডিয়ার মনোযোগ সরে যায়, ভুক্তভোগীর পরিবার একা হয়ে পড়ে, সাক্ষীরা দুর্বল হয়ে যায়, আর আসামিপক্ষ ‘দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন অবস্থায় আটক’ থাকার যুক্তিতে জামিনের আবেদন করে।
এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় সঙ্কট। অপরাধ যত বড়ই হোক, বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। Justice delayed is justice denied, এ কথাটি আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধে বিচার বিলম্বিত হওয়া শুধু ন্যায়বিচার অস্বীকার নয়; এটি সমাজে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পাঠায় যে, রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত শিশুদের রক্ষা করতে অক্ষম।
আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এখনো অনেক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে। মামলার তারিখ পড়ে, সাক্ষী আসে না, তদন্ত অসম্পূর্ণ থাকে, প্রসিকিউশন দুর্বল থাকে, ফরেনসিক সক্ষমতা সীমিত থাকে, আদালতে পর্যাপ্ত কেস ম্যানেজমেন্ট থাকে না। এর ফলে বিচারপ্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং প্রায়ই নিষ্ঠুর যাত্রায় পরিণত হয়- বিশেষ করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য।
শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলায় বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। প্রথমত, এসব মামলার তদন্ত দ্রুত ও পেশাদারভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা শিশুসংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার প্রমাণ সংগ্রহ, মেডিক্যাল রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত, ডিজিটাল প্রমাণ এবং সাক্ষ্যগ্রহণ সঠিকভাবে করতে পারেন। দুর্বল তদন্তের কারণে যেন কোনো অপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যেতে না পারে।
দ্বিতীয়ত, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার জন্য কার্যকর বিশেষ আদালত বা বিশেষ ট্র্যাক থাকা দরকার। শুধু আইন করে সময়সীমা নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই সময়সীমা বাস্তবে কার্যকর করার প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিচারকদের সক্রিয় কেস ম্যানেজমেন্টের ক্ষমতা ও অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মুলতবি, বারবার সময় নেয়া, সাক্ষী বিলম্ব, কৌশলগত দেরি- এসব বন্ধ করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়াকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া যাবে না।
চতুর্থত, জামিনের প্রশ্নে বিশেষ সতর্কতা দরকার। অবশ্যই আইন অনুযায়ী একজন অভিযুক্তের অধিকার আছে; কিন্তু শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধে আদালতকে ভুক্তভোগীর পরিবার, সাক্ষীর নিরাপত্তা, সমাজে প্রভাব এবং অপরাধের প্রকৃতি- সব কিছু বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু দীর্ঘদিন বিচার না হওয়া যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিনের ভিত্তি না হয়ে যায়।
পঞ্চমত, ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিতে হবে। আমাদের বিচারব্যবস্থা প্রায়ই ভুক্তভোগীকে একা রেখে দেয়। মামলা চলাকালে পরিবারকে সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি, আর্থিক সঙ্কট, মানসিক ট্রমা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ মোকাবেলা করতে হয়। তাই শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা দিতে হবে।
কিন্তু এই সঙ্কট শুধু আদালত বা পুলিশের নয়। আমাদের সমাজের ভেতরেও ভয়াবহ অন্ধকার আছে। স্বীকার করতে হবে- শিশু নির্যাতনকারী সবসময় অচেনা কোনো দানব নয়। সে অনেক সময় প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তি, পরিবারের বন্ধু, স্থানীয় প্রভাবশালী কিংবা খুব কাছের কেউ। এটিই সবচেয়ে ভয়ের বিষয়।
তাই পরিবারকে সতর্ক হতে হবে। পরিচিত মানুষ মানেই নিরাপদ- এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিশুদের বয়স অনুযায়ী শরীরের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমানা, অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ এবং বিপদের সঙ্কেত সম্পর্কে শেখাতে হবে। কোনো শিশু যদি অস্বস্তি প্রকাশ করে, ভয় পায়, কারো কাছে যেতে না চায়, বা আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়- তাকে অবহেলা করা যাবে না। শিশুর কথা শুনতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে, গুরুত্ব দিতে হবে।
সমাজকেও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশ্বাসযোগ্য সন্দেহ থাকে, তাহলে তাকে সামাজিকভাবে আড়াল করা যাবে না। লোকলজ্জা, পরিবারের সম্মান, বংশের মান, গ্রামের কথা- এসব অজুহাতে শিশু নির্যাতন ঢেকে রাখার অর্থ অপরাধীকে সহায়তা করা। শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে সামাজিক সম্মান বড় হতে পারে না।
যদি কারো বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকে বা কারো আচরণ সন্দেহজনক মনে হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। অভিভাবকদের সতর্ক করতে হবে। শিশুদের তার কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে। সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করা যাবে না।
রাজনীতিবিদদেরও এই প্রশ্নে দায় আছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলে শুধু বিবৃতি দেয়া, শোক প্রকাশ করা বা কঠোর শাস্তির দাবি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সংসদ, সরকার, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার প্রশাসনকে একসাথে বসে ভাবতে হবে, আমাদের আইন কি যথেষ্ট? তদন্ত ব্যবস্থা কি কার্যকর? আদালত কি সময়মতো বিচার করতে পারছে? সাক্ষীর সুরক্ষা আছে কি? ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে কি? পুলিশের জবাবদিহি আছে কি?
শুধু মৃত্যুদণ্ডের দাবি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কঠোর শাস্তি প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু কঠোর শাস্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিশ্চিত শাস্তি। অপরাধী যদি জানে যে তদন্ত দুর্বল হবে, বিচার বিলম্বিত হবে, সাক্ষী প্রভাবিত করা যাবে এবং শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে, তাহলে কঠোর আইনও ভয় সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হবে। আইনের শক্তি শুধু শাস্তির মাত্রায় নয়; আইনের শক্তি তার দ্রুততা, নিরপেক্ষতা এবং নিশ্চিত প্রয়োগে।
আমাদের অপরাধবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদেরও যুক্ত করতে হবে। কেন এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে? কোন সামাজিক, মানসিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণ এসব অপরাধকে সম্ভব করছে? পর্নোগ্রাফি, মাদক, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীবিদ্বেষী মানসিকতা- এসব বিষয়ের সাথে শিশু নির্যাতনের সম্পর্ক কী? গবেষণাভিত্তিক নীতি না হলে আমরা শুধু ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করব; কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারব না।
স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দির, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘শিশু সুরক্ষা নীতি’ থাকা উচিত। শিক্ষক, কর্মচারী, পরিবহনকর্মী, কোচিং সেন্টার, হোস্টেল- সব জায়গায় শিশু সুরক্ষার ন্যূনতম মানদণ্ড থাকা দরকার। শিশুদের সাথে কাজ করা ব্যক্তিদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, আচরণবিধি এবং অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ পদ্ধতি থাকা জরুরি।
মিডিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর পরিচয় প্রকাশ, সংবেদনশীল তথ্য প্রচার, ভুক্তভোগী পরিবারকে আরো ট্রমাটাইজ করা- এসব পরিহার করতে হবে। কিন্তু একই সাথে মিডিয়াকে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি অনুসরণ করতে হবে। ঘটনা ঘটার পর কয়েক দিন প্রচার করে ভুলে গেলে চলবে না। মামলা কোথায় গেল, তদন্ত শেষ হলো কি না, চার্জশিট হলো কি না, বিচার শুরু হলো কি না, রায় হলো কি না, এসব বিষয়ে জনস্বার্থে নজর রাখা মিডিয়ার দায়িত্ব।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎ বা জিডিপি দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা সক্ষম তার ওপর। শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাই রাষ্ট্রের নৈতিক পরীক্ষার জায়গা।
বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। এই ব্যর্থতা মেনে নেয়া যায় না। এখন সময় রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার, বিচারব্যবস্থা কার্যকর করার, শিশুর নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করার।
লেখক : আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



